দেশের মানুষ বর্তমান সরকারের ওপর বিরক্ত এবং এই সরকারের কাছ থেকে মুক্তি চায় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের আগে জনগণকে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সরকার সেগুলো রক্ষা করতে পারেনি।
শনিবার দুপুরে কুমিল্লার পদুয়া বাজার এলাকায় ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি দ্রুত কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নের দাবি জানান। পাশাপাশি কুমিল্লা বিমানবন্দর পুনরায় চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আহ্বান জানান তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৯৪ সালে সিলেট বিভাগ প্রতিষ্ঠার সময়ই কুমিল্লাকে বিভাগ করার দাবি উঠেছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই দাবি বাস্তবায়িত হয়নি। কুমিল্লাবাসীর ‘অপরাধ কী’—এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কুমিল্লা বিভাগ নিয়ে আর ‘ধানাই-পানাই’ না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বৃহত্তর নোয়াখালী থেকেও বিভাগ করার দাবি রয়েছে উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, তারাও বিভাগ পাওয়ার দাবিদার। তবে তাঁর মতে, আগে কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা। ব্যঙ্গাত্মকভাবে তিনি বলেন, ‘কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো! চাঁদাবাজ নাই! আছে?’ এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
শফিকুর রহমান জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পর পর্যায়ক্রমে দেশের প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে একই ধরনের কর্মসূচি পালন করবে ১১ দলীয় ঐক্য। এরপর ঢাকায় মহাসমাবেশ করা হবে। দাবি আদায়ের সেই কর্মসূচিতেও কুমিল্লার মানুষকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পথসভায় জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, সরকারের মন্ত্রীদের সন্তান, পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের অনেকে দুর্নীতি এবং বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, গত ছয় মাসে সরকার দেশ পরিচালনায় ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থ’ হয়েছে। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর কোনোটিই সরকার বাস্তবায়ন করতে পারেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, দেশের মানুষের বক্তব্য সরকারকে শুনতে হবে। তাঁর দাবি, দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ বলছে, তারা বর্তমান সরকারকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না।
দেশের পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করে অলি আহমদ বলেন, বিভিন্ন জায়গায় দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মাস্তানি, জমি দখল, নেতা-কর্মীদের হয়রানি ও মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি ‘জাহান্নাম’-এর সঙ্গে তুলনা করেন।
সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়েও মন্তব্য করেন এলডিপি সভাপতি। তাঁর দাবি, মানুষের মধ্যে আলোচনা রয়েছে যে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের পতন ঘটতে পারে। সরকার কিছু করুক বা না করুক, ‘নিজের ভারে নিজেই পড়ে যাবে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, জনগণের রায় কার্যকর ও জনদুর্ভোগ কমাতে সরকার ব্যর্থ হলে বিরোধীদের আন্দোলন আরও বিস্তৃত হবে। তাঁর ভাষ্য, এই কর্মসূচি একপর্যায়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত গণজোয়ারে রূপ নিতে পারে।
সরকার ‘ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে বলেও অভিযোগ করেন মামুনুল হক। তিনি বলেন, দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে তাঁরা তা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর দাবি অনুযায়ী, ৭০ শতাংশ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন আরও জোরদার হবে।
পথসভায় আরও বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটওয়ারী, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা।
এদিকে লংমার্চ ও পথসভার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে যান চলাচলে ধীরগতি তৈরি হয়। পদুয়া বাজারের পথসভায় বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী অংশ নেন। তাঁদের অনেকে ঢাকামুখী লেনের অংশে অবস্থান নেওয়ায় যানবাহনের গতি কমে যায়। অন্যদিকে চট্টগ্রামমুখী লেনে লংমার্চের বড় গাড়িবহরের কারণে থেমে থেমে যানজট দেখা দেয়। এতে যাত্রী ও চালকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
শনিবার সকালে রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ শুরু হয়। কর্মসূচিটি চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা। পথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পথসভার কর্মসূচি রাখা হয়েছে।
১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় অবিলম্বে বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও অপরাধ দমন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।


