ক্যানসার প্রতিরোধে জীবনযাপনের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবার খেলেই ক্যানসার হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত পরিমাণে কিছু খাবার গ্রহণ, খাবার প্রক্রিয়াজাত করার ধরন এবং রান্নার পদ্ধতির সঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক থাকতে পারে।
আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থার তথ্য এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, তরুণ বয়স থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। খাদ্যতালিকায় টাটকা ফলমূল, শাকসবজি ও গোটা শস্য রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সামগ্রিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের অনকোলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. অরুনাংশু দাসের মতে, কোনো খাবার সম্পর্কে সচেতন হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেটি খেলেই কারও ক্যানসার হবে। মূল বিষয় হলো দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস ও অতিরিক্ত গ্রহণের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা।
তাই কোন ধরনের খাবার ও পানীয়ের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন, তা জেনে নেওয়া যাক।
১. অতিরিক্ত লাল মাংস
গরু, খাসি ও ভেড়ার মাংস অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়ার সঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ক্ষেত্রে লাল মাংস গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তাই খাদ্যতালিকায় লাল মাংস থাকলেও এর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা ভালো।
২. প্রক্রিয়াজাত মাংস
সসেজ, পেপারনি ও সালামির মতো প্রক্রিয়াজাত মাংসের বিষয়ে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এসব খাবার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ফলে নিয়মিত এসব খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা কমিয়ে আনা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।
৩. অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার
বর্তমান সময়ে প্যাকেটজাত ও দ্রুত খাওয়ার উপযোগী নানা খাবার জনপ্রিয়। এর মধ্যে রয়েছে কুকি, চানাচুর, চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, ইনস্ট্যান্ট স্যুপ, প্যাকেটজাত কেক, চিনিযুক্ত কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংক।
এসব অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত ও বেশি পরিমাণে খাওয়ার সঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে চিনিযুক্ত পানীয় নিয়মিত গ্রহণের ফলে সময়ের সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন বাড়তে পারে। আর অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে ১৩ ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে। তাই এসব খাবারের পরিবর্তে যতটা সম্ভব টাটকা ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
৪. অতিরিক্ত তাপে রান্না করা কিছু খাবার
আলু ও শস্যজাতীয় খাবার উচ্চ তাপমাত্রায় ভাজা বা বেক করার সময় অ্যাক্রিলামাইড নামের একটি রাসায়নিক তৈরি হতে পারে।
মানুষের শরীরে অ্যাক্রিলামাইডের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। তবে প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় এর সঙ্গে ক্যানসারের সংযোগ পাওয়া গেছে।
তাই উচ্চ তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় ধরে ভাজা বা বেক করা খাবার অতিরিক্ত না খাওয়াই ভালো।
৫. অ্যালকোহল
ক্যানসারের ঝুঁকি বিবেচনায় অ্যালকোহল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কম পরিমাণ অ্যালকোহলও সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
তাই অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় না খাওয়াই নিরাপদ।
৬. আফলাটক্সিনযুক্ত খাবার
আফলাটক্সিন নিজে কোনো খাবার নয়। এটি এক ধরনের ক্ষতিকর পদার্থ, যা ছত্রাকের আক্রমণে কিছু খাদ্যপণ্যে তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ছত্রাক পড়া বাদাম, শস্যদানা কিংবা অন্য কোনো খাদ্যপণ্যে আফলাটক্সিন থাকার আশঙ্কা থাকে। এই উপাদান লিভার ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই ছত্রাক পড়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া খাদ্যপণ্য না খাওয়াই ভালো।
৭. অতিরিক্ত গরম পানীয়
চা বা কফির মতো গরম পানীয় খাওয়ার ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো এর তাপমাত্রা। অতিরিক্ত গরম পানীয় নিয়মিত পান করলে খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার পানীয় নিয়মিত গ্রহণের সঙ্গে খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে।
তাই চা, কফি কিংবা অন্য কোনো পানীয় খাওয়ার আগে কিছুটা ঠান্ডা করে নেওয়া ভালো।
৮. নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে লবণ দিয়ে সংরক্ষিত মাছ
চীনা পদ্ধতিতে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা মাছের সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশে প্রচলিত শুঁটকি তৈরির পদ্ধতি এর থেকে আলাদা। তাই দেশের সব ধরনের শুঁটকিকে একইভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বলা যায় না। তবে সব শুঁটকিই সম্পূর্ণ নিরাপদ—এমন ধারণাও করা ঠিক নয়।
সংরক্ষণের সময় ছত্রাকের আক্রমণ না হওয়া এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শুঁটকি খেলে তা পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রান্নার সময় অতিরিক্ত লবণ না দেওয়াই ভালো।
খাবারের ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য কী হবে?
ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে কোনো একটি খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চেয়ে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত টাটকা ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়া, গোটা শস্যের তৈরি খাবার রাখা এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত লাল মাংসের পরিমাণ কমানো যেতে পারে।
এর পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখাও জরুরি। অর্থাৎ তরুণ বয়স থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন গড়ে তুললে দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে তা সহায়ক হতে পারে।
তবে কোনো খাবার নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে উদ্বেগ থাকলে বা নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে নিজের মতো খাদ্যতালিকা পরিবর্তন না করে চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

