শিশুর পেটব্যথা হলে অনেক অভিভাবকই প্রথমে ধরে নেন, গ্যাসের কারণেই এমনটা হচ্ছে। এরপর গ্যাসের ওষুধ দিলেই সমস্যা কমে যাবে বলে মনে করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, পেটব্যথা নিজে কোনো রোগ নয়; বরং এটি শরীরে কোনো সমস্যা থাকার একটি সংকেত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুর পেটব্যথার কারণ সাধারণ হলেও কখনো কখনো এটি অ্যাপেন্ডিসাইটিস, অন্ত্রের জটিলতা, মূত্রনালির সংক্রমণসহ জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে এমন সমস্যার লক্ষণও হতে পারে।
শিশুর পেটব্যথার অন্যতম সাধারণ কারণ হলো কোষ্ঠকাঠিন্য। শিশু কয়েক দিন পরপর মলত্যাগ করলে, পায়খানা শক্ত হলে কিংবা মলত্যাগের সময় ব্যথা অনুভব করলে কোষ্ঠকাঠিন্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়। কিছু শিশু পায়খানা চেপে রাখার অভ্যাসও করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পেটে অস্বস্তি বা ব্যথা দেখা দিতে পারে।
গ্যাস ও পেট ফাঁপাও শিশুদের পেটব্যথার একটি পরিচিত কারণ। খুব দ্রুত খাবার খাওয়া, খাবারের সময় অতিরিক্ত বাতাস গিলে ফেলা কিংবা নির্দিষ্ট কিছু খাবারের কারণে অন্ত্রে অতিরিক্ত গ্যাস তৈরি হতে পারে। কোনো কোনো শিশুর ক্ষেত্রে খাবারে অ্যালার্জির কারণেও পেট ফাঁপা ও ব্যথা হতে পারে।
ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকেও শিশুর পেটব্যথা হতে পারে। এ ধরনের সংক্রমণের ক্ষেত্রে শুধু পেটব্যথা নয়, সঙ্গে বমি, ডায়রিয়া ও জ্বরও দেখা দিতে পারে। তাই পেটব্যথার সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ আছে কি না, সেটিও খেয়াল করা প্রয়োজন।
অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ক্ষেত্রেও শুরুতে শিশুর পেটব্যথা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের ব্যথা অনেক সময় প্রথমে নাভির চারপাশে শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে পেটের ডান দিকের নিচের অংশে চলে যেতে পারে। হাঁটাচলা, লাফানো কিংবা শরীরের নড়াচড়ার সময় ব্যথা আরও বেড়ে যেতে পারে। এমন লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
মূত্রনালির সংক্রমণও শিশুর পেটব্যথার একটি কারণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পেটব্যথার সঙ্গে প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাব, দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব কিংবা জ্বর থাকতে পারে। তাই শিশুর পেটব্যথার সঙ্গে প্রস্রাবের কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, সেটিও অভিভাবকদের লক্ষ্য করা উচিত।
কিছু শিশুর ক্ষেত্রে কৃমির কারণেও বারবার পেটব্যথা বা পেটে অস্বস্তি হতে পারে। পাশাপাশি ক্ষুধার পরিবর্তনও দেখা যেতে পারে। আবার দুধ বা নির্দিষ্ট কোনো খাবার খাওয়ার পর যদি পেটব্যথা, পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া কিংবা বমি হয়, তাহলে খাবারে অ্যালার্জির বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়।
তবে সব পেটব্যথা সাধারণ সমস্যা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। শিশুর পেটব্যথা তীব্র হলে কিংবা সময়ের সঙ্গে ব্যথা ক্রমেই বাড়তে থাকলে সতর্ক হতে হবে। ব্যথা দীর্ঘ সময় ধরে থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে বারবার পেটব্যথা ফিরে এলেও এর কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।
পেটের ডান দিকের নিচে বেশি ব্যথা, পেট ফুলে শক্ত হয়ে যাওয়া, সবুজ রঙের বমি বা পায়খানায় রক্ত দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত। উচ্চমাত্রার জ্বরের সঙ্গে তীব্র পেটব্যথা থাকলেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
শিশু যদি অস্বাভাবিকভাবে নিস্তেজ, ফ্যাকাশে বা ঝিমিয়ে পড়ে, পানি পান করতে না পারে কিংবা বারবার বমি করে, তাহলেও দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া শরীরে পানিশূন্যতার ইঙ্গিত হতে পারে। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করাই ভালো।
শিশুর অণ্ডকোষে ব্যথা বা ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকলেও তা অবহেলা করা উচিত নয়। পেটব্যথার সঙ্গে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
সাধারণভাবে শিশুর পেটব্যথা হলে তাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া এবং পর্যাপ্ত তরল পান করানো গুরুত্বপূর্ণ। বয়স উপযোগী স্বাভাবিক খাবার চালিয়ে যেতে হবে। অযথা শিশুকে না খাইয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। পাশাপাশি শিশুর আগে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা ছিল কি না, মলত্যাগের ধরন কেমন এবং ব্যথার সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিয়েছে কি না—এসব বিষয় খেয়াল করা দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর পেটব্যথাকে প্রতিবারই শুধু গ্যাসের সমস্যা হিসেবে ধরে না নেওয়া। সাধারণ কারণের পাশাপাশি কিছু গুরুতর সমস্যারও প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে পেটব্যথা। তাই ব্যথার ধরন, স্থায়িত্ব এবং সঙ্গে থাকা অন্যান্য উপসর্গ লক্ষ্য করে প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

