সারা দিনের ব্যস্ততা ও পরিশ্রমের পর বিছানায় গেলেই ঘুম চলে আসবে—এমন ধারণা অনেকের। বাস্তবে দেখা যায়, ক্লান্ত থাকার পরও অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিছানায় শুয়ে থাকেন, কিন্তু ঘুম আসে না। আবার কারও ঘুম এলেও মাঝরাতে বারবার ভেঙে যায়। ভালো ঘুমের জন্য শরীর ও মনকে একটি নির্দিষ্ট ছন্দে অভ্যস্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন আনলে ঘুমের পরিবেশ ও নিয়ম উন্নত করা সম্ভব।
প্রথমেই গুরুত্ব দিতে হবে ঘুম ও ঘুম থেকে ওঠার নির্দিষ্ট সময়ের ওপর। মানুষের শরীরে প্রাকৃতিক একটি ঘড়ি রয়েছে, যাকে ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বলা হয়। প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং সকালে নির্দিষ্ট সময়ে ওঠার অভ্যাস এই ছন্দ ঠিক রাখতে সহায়তা করে। ছুটির দিনেও ঘুমের সময়সূচিতে বড় পরিবর্তন না আনাই ভালো। দিনের বেলায় দীর্ঘ সময় ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে সেটিও রাতের ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে। খুব ক্লান্ত হলে দুপুরে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের ছোট ঘুম নেওয়া যেতে পারে।
আলোও ঘুমের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর কিছু সময় প্রাকৃতিক আলোতে থাকা শরীরের ঘুম-জাগরণের ছন্দ বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল, কম্পিউটার বা টেলিভিশনের সামনে কাটানো কমানো ভালো। স্ক্রিনের আলো ছাড়াও ফোনে ভিডিও দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কিংবা অন্য উত্তেজক কর্মকাণ্ড ঘুমাতে দেরি হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই ঘুমানোর এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমিয়ে আনার অভ্যাস করা যেতে পারে।
ঘুমের জন্য শোবার ঘরের পরিবেশও আরামদায়ক হওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত গরম ঘরে অনেকের ঘুমাতে অসুবিধা হতে পারে। ঘর কিছুটা শীতল ও আরামদায়ক রাখার পাশাপাশি আলো ও শব্দ কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। ঘুমানোর এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে হালকা গরম পানিতে গোসলও অনেকের জন্য আরামদায়ক হতে পারে।
শোবার ঘরকে যতটা সম্ভব ঘুম ও বিশ্রামের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিছানায় বসে দীর্ঘ সময় অফিসের কাজ, পড়াশোনা কিংবা মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস কমানো যেতে পারে। ঘরে অতিরিক্ত আলো থাকলে পর্দা ব্যবহার এবং বাইরের শব্দ বেশি হলে তা কমানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিছানা ও বালিশও ব্যক্তির জন্য আরামদায়ক হওয়া প্রয়োজন।
খাবারের সময় ও ধরনও রাতের ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে। ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী বা অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার না খাওয়াই ভালো। সম্ভব হলে ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা যেতে পারে। একইভাবে ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত তরল গ্রহণ করলে রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
ক্যাফেইনের বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। চা ও কফিতে থাকা ক্যাফেইনের প্রভাব কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। যাঁদের ঘুমের সমস্যা রয়েছে, তাঁরা দিনের শেষভাগে চা-কফি কমিয়ে দেখতে পারেন। নিকোটিনও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই ধূমপান পরিহার করাও ঘুম ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
শুধু শরীর নয়, ঘুমের আগে মনকেও শান্ত করা দরকার। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে বারবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কতক্ষণ ঘুমানো যাবে, সেই হিসাব করতে থাকলে উদ্বেগ বাড়তে পারে। ঘড়ি বা ফোন দূরে রেখে ধীরে শ্বাস নেওয়া এবং মনকে শান্ত করার চেষ্টা করা যেতে পারে। পরের দিনের কাজ নিয়ে চিন্তা হলে ঘুমানোর আগে প্রয়োজনীয় কাজের একটি ছোট তালিকা লিখে রাখাও কারও কারও ক্ষেত্রে মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ঘুম না এলে ‘এখনই আমাকে ঘুমাতে হবে’—এমন চাপ তৈরি না করাও গুরুত্বপূর্ণ। ঘুম নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা উল্টো ঘুম আসতে আরও বাধা তৈরি করতে পারে।
দীর্ঘদিন অনিদ্রা থাকলে নিজে থেকে ঘুমের ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট শুরু করা ঠিক নয়। মেলাটোনিন বা ম্যাগনেসিয়ামের মতো সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রার ক্ষেত্রে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি ফর ইনসমনিয়া বা সিবিটি-আই ব্যবহৃত হয়।
নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি, দিনের আলো, আরামদায়ক শোবার পরিবেশ, খাবার ও ক্যাফেইনে নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ কমানোর অভ্যাস—সবকিছু মিলিয়েই ভালো ঘুমের পরিবেশ তৈরি হয়। এসব অভ্যাস মেনে চলার পরও কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘুমের সমস্যা অব্যাহত থাকলে কিংবা ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা, অতিরিক্ত নাক ডাকা বা দিনের বেলায় অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

