বলিভিয়ার দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গলে পাওয়া একটি ছোট বিড়ালকে প্রথমে সাধারণ পোষা বিড়াল বলেই মনে করেছিলেন স্থানীয় এক বাসিন্দা। শরীরে ছোপ ছোপ দাগ, আকারেও অনেকটা পরিচিত পোষা বিড়ালের মতো। কিন্তু প্রাণীটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার আচরণে অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। পরে গবেষকেরা পরীক্ষা করে জানতে পারেন, এটি আসলে এত দিন বিজ্ঞানের অজানা একটি বন্য বিড়াল প্রজাতির সদস্য।
নতুন এই প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘লেপার্ডাস টিলকায়ো’। আর গবেষকদের কাছে বর্তমানে পরিচিত একমাত্র জীবিত সদস্যটিকে ডাকা হচ্ছে ‘টাইগ্রিনো’ নামে। টাইগ্রিনোর বয়স এখন প্রায় ১০ বছর। লম্বায় প্রায় ১৮ ইঞ্চি এবং ওজন প্রায় দেড় কেজি।
টাইগ্রিনোকে বলিভিয়ার ইউঙ্গাস অঞ্চল থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। ঘন বন ও পাহাড়ে ঘেরা এই অঞ্চল প্রায়ই মেঘে ঢাকা থাকে এবং বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও বেশি। প্রথমে স্থানীয় এক বাসিন্দা প্রাণীটিকে পোষা বিড়াল ভেবে নিজের কাছে রেখেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এর আচরণ সাধারণ গৃহপালিত বিড়ালের মতো না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রাণীটির জায়গা হয় একটি আশ্রয়কেন্দ্রে।
সেখানেই টাইগ্রিনোর দিকে নজর পড়ে বলিভিয়ার বিজ্ঞানী নোগালেস-আসারুনসের। তিনি ওই আশ্রয়কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছিলেন। প্রাণীটির শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও আচরণ দেখে তাঁর মনে হয়, এটি সাধারণ পোষা বিড়াল নয়, বরং কোনো ধরনের বন্য বিড়াল।
এরপর প্রাণীটিকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। গবেষণায় যুক্ত হন আরও কয়েকজন বিজ্ঞানী। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার পর গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান, টাইগ্রিনো এত দিন পরিচিত কোনো বন্য বিড়াল প্রজাতির সদস্য নয়। এটি আলাদা একটি প্রজাতি।
নতুন এই বন্য বিড়াল নিয়ে গবেষণাটি বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘কারেন্ট বায়োলজি’তে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাপত্রটির সহলেখকদের একজন বিজ্ঞানী নোগালেস-আসারুনস। গবেষণায় নতুন প্রজাতিটির বৈজ্ঞানিক পরিচয় তুলে ধরার পাশাপাশি এর আবাসস্থল ও আচরণ সম্পর্কেও প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের ধারণা, এই প্রজাতির বন্য বিড়াল মূলত রাতে বেশি সক্রিয় থাকে। টাইগ্রিনোর মল পরীক্ষা করে সেখানে ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। এ থেকে গবেষকেরা ধারণা করছেন, ছোট আকারের ইঁদুরজাতীয় প্রাণী এর খাদ্যের অংশ হতে পারে।
সবচেয়ে বড় রহস্য তৈরি হয়েছে নতুন প্রজাতিটির অন্য সদস্যদের নিয়ে। এখন পর্যন্ত টাইগ্রিনো ছাড়া একই প্রজাতির আর কোনো জীবিত বন্য বিড়ালের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফলে বলিভিয়ার জঙ্গলে এই প্রজাতির আরও সদস্য রয়েছে কি না, থাকলে তাদের সংখ্যা কত কিংবা ঠিক কোন কোন এলাকায় তাদের বিচরণ—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
বন্য ও পোষা—সব ধরনের বিড়ালজাতীয় প্রাণী ফেলিডাই নামের জৈবিক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। বাঘ, সিংহ ও চিতার মতো বড় প্রাণী থেকে শুরু করে ছোট বন্য ও পোষা বিড়ালও এই পরিবারের সদস্য।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এত দিন ফেলিডাই পরিবারের ৪১টি প্রজাতি পরিচিত ছিল। নতুন এই বন্য বিড়াল যুক্ত হওয়ার পর সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২-এ। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীতে বিড়ালজাতীয় প্রাণীর প্রকৃত প্রজাতির সংখ্যা ৪৪ বা তারও বেশি হতে পারে।
টাইগ্রিনোর সন্ধান তাই শুধু নতুন একটি বন্য বিড়াল শনাক্ত করার ঘটনা নয়; এটি বলিভিয়ার ইউঙ্গাস অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। বর্তমানে একটি সদস্যের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেলেও এর বিস্তৃতি, সংখ্যা, খাদ্যাভ্যাস ও সংরক্ষণ পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও জানতে গবেষকদের সামনে এখন বড় কাজ হলো বন্য পরিবেশে একই প্রজাতির অন্য সদস্যদের খুঁজে বের করা।

