উচ্চ রক্তচাপকে প্রায়ই ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। কারণ, অনেক মানুষের রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলেও তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটি অজানাই থেকে যেতে পারে। অথচ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক, কিডনি, চোখ ও রক্তনালির ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। অনেকেই নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা না করায় নিজের অবস্থার কথা জানতে পারেন না। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত রক্তচাপ মাপার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ে।
রক্ত ধমনির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় ধমনির দেয়ালে যে চাপ সৃষ্টি করে, সেটিই রক্তচাপ। রক্তচাপের দুটি সংখ্যা থাকে। উপরের সংখ্যাটি সিস্টোলিক এবং নিচের সংখ্যাটি ডায়াস্টোলিক চাপ নির্দেশ করে। কয়েক দিন সঠিক নিয়মে পরিমাপের পরও রক্তচাপ বেশি পাওয়া গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
উচ্চ রক্তচাপের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট একটি কারণ চিহ্নিত করা যায় না। আবার কিছু ক্ষেত্রে কিডনির রোগ, হরমোনজনিত সমস্যা বা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের কারণে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত ওজন ও ডায়াবেটিসের মতো সমস্যাও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে হৃদ্যন্ত্র। উচ্চ চাপের বিপরীতে শরীরে রক্ত পাঠাতে হৃদ্যন্ত্রকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে হৃদ্যন্ত্রের পেশিতে পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে করোনারি ধমনির রোগ, হার্ট অ্যাটাক এবং হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
কিডনির জন্যও অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। গুরুতর অবস্থায় কিডনি বিকল হলে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।
স্ট্রোকের সঙ্গেও উচ্চ রক্তচাপের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। মস্তিষ্কের রক্তনালি বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি উচ্চ রক্তচাপে বাড়তে পারে। গুরুতর স্ট্রোক মৃত্যু বা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতার কারণ হতে পারে।
চোখও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। উচ্চ রক্তচাপের কারণে রেটিনার রক্তনালিতে পরিবর্তন বা ক্ষতি হলে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া শরীরের প্রান্তিক রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশেষ করে পায়ে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ মহাধমনির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। মহাধমনির কোনো অংশ অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত হয়ে এনিউরিজম তৈরি হলে তা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
রক্তচাপ বারবার বেশি পাওয়া গেলে শুধু একটি পরিমাপের ভিত্তিতে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক প্রস্রাব পরীক্ষা, অ্যালবুমিন, রক্তের ক্রিয়েটিনিন, শর্করা ও চর্বিসহ বিভিন্ন পরীক্ষা দিতে পারেন। এর মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে অন্য কোনো রোগ বা ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা মূল্যায়ন করা যায়।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে জীবনযাত্রার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান পরিহার, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা, খাবারে অতিরিক্ত লবণ কমানো এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস উপকারী। ডায়াবেটিস বা উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো সমস্যা থাকলে সেগুলোও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।
যাঁদের চিকিৎসক রক্তচাপের ওষুধ দিয়েছেন, তাঁদের নিয়মিত ওষুধ সেবন করা জরুরি। ওষুধ খাওয়ার পর রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে গেলেই নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা ঠিক নয়। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই ওষুধের কারণেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন বা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের পরামর্শেই নেওয়া উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসা নেওয়া। উচ্চ রক্তচাপের দৃশ্যমান লক্ষণ না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সময়মতো শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াই জটিলতার ঝুঁকি কমানোর প্রধান উপায়।

