গাছের সরু ডালে বসেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে ছোট ছোট পাখি। বাতাসে ডাল দুললেও তাদের খুব একটা সমস্যা হয় না। মানুষের ক্ষেত্রে ঘুমের সময় শরীরের সচেতন নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই কমে যায়। তাহলে পাখি গভীর ঘুমে থাকার পরও কীভাবে ডাল আঁকড়ে ধরে রাখে? এর পেছনে রয়েছে তাদের পা, আঙুল, পেশি ও টেন্ডনের বিশেষ শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থা।
গাছের ডালে বসবাসকারী ছোট পাখির বড় একটি অংশ পারচিং বার্ড বা প্যাসারিন গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এসব পাখির পায়ের গঠনই এমনভাবে তৈরি, যাতে তারা সহজে গাছের ডাল আঁকড়ে ধরতে পারে। সাধারণত এদের পায়ের তিনটি আঙুল সামনের দিকে এবং একটি আঙুল পেছনের দিকে থাকে। পেছনের এই আঙুলকে বলা হয় ‘হ্যালুক্স’।
পাখি যখন কোনো ডালের ওপর বসে এবং নিজের শরীরের ওজন পায়ের ওপর দেয়, তখন পায়ের জয়েন্টগুলো বাঁকতে শুরু করে। এর সঙ্গে পায়ের পেছনের টেন্ডনেও টান পড়ে। এই টানের কারণে আঙুলগুলো স্বাভাবিকভাবেই ডালের চারপাশে শক্তভাবে জড়িয়ে যায়।
এই ব্যবস্থা অনেকটা স্বয়ংক্রিয়। অর্থাৎ ঘুমানোর সময় পাখিকে সচেতনভাবে ভাবতে হয় না যে তাকে ডাল শক্ত করে ধরে রাখতে হবে। শরীরের ওজন ও পায়ের বিশেষ গঠনই ডাল আঁকড়ে থাকতে সাহায্য করে। এ কারণে ঘুমিয়ে পড়ার পরও অনেক পারচিং পাখি সহজে ডাল থেকে পড়ে যায় না।
তবে সব পাখির ক্ষেত্রে একই কৌশল কাজ করে না। বিভিন্ন প্রজাতির পায়ের গঠন ও বিশ্রাম নেওয়ার পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। ফ্লেমিংগো বা বকের মতো কিছু পাখি এক পায়ে দাঁড়িয়েও দীর্ঘ সময় বিশ্রাম নিতে পারে। আবার ইউরোপীয় স্টার্লিংয়ের মতো কিছু পাখির ক্ষেত্রে ঘুমানোর সময় আঙুল দিয়ে সব সময় খুব শক্তভাবে ডাল চেপে ধরে থাকার প্রয়োজন হয় না। তাদের পায়ের গঠন শরীরকে স্থিতিশীল অবস্থায় রাখতে সাহায্য করে।
পাখিদের ঘুমানোর ভঙ্গিতেও শরীরের তাপ ধরে রাখার কৌশল দেখা যায়। অনেক পাখি বিশ্রামের সময় একটি পা শরীরের কাছাকাছি গুটিয়ে রাখে। একই সঙ্গে মাথা পেছনের দিকে নিয়ে পালকের মধ্যে গুঁজে রাখে। নরম পালক শরীরের তাপ ধরে রাখতে সহায়তা করে।
আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, বাতাসে ডাল নড়তে থাকলে পাখি কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখে? এ ক্ষেত্রেও পাখির পা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পায়ের হাড়, পেশি ও টেন্ডন একসঙ্গে কাজ করে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে, যা ডালের ছোটখাটো নড়াচড়ার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।
২০১৯ সালের একটি গবেষণায় পাখির এই ভারসাম্য রক্ষার কৌশল নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ডিজিটাল মডেলের সাহায্যে গবেষকেরা দেখেন, পায়ের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে কাজ করার কারণে ডালের নড়াচড়ার মধ্যেও পাখি তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকতে পারে। বিশেষ করে টেন্ডনের দৃঢ়তা ছোটখাটো ধাক্কা ও নড়াচড়া সামলাতে সহায়তা করে।
তবে সব পাখির পায়ের আঙুলও একইভাবে সাজানো নয়। কাঠঠোকরা ও টিয়ার মতো পাখির পায়ের গঠন পারচিং পাখিদের তুলনায় আলাদা। ফলে তাদের ডালে বসা, গাছে আঁকড়ে থাকা কিংবা চলাচলের কৌশলেও পার্থক্য দেখা যায়।
মূলত পাখিদের ডালে ঘুমানোর এই ক্ষমতা কোনো সচেতন প্রচেষ্টার ওপর নির্ভরশীল নয়। তাদের পায়ের বিশেষ গঠন, আঙুলের অবস্থান, পেশি ও টেন্ডনের সমন্বিত কাজ শরীরকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। প্রকৃতিতে টিকে থাকার জন্য বিবর্তিত এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই অনেক পাখি গাছের ডালে বসে নিরাপদে বিশ্রাম ও ঘুমাতে পারে।

