জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন প্রতিবছরই বিশ্বনেতাদের অন্যতম বড় কূটনৈতিক মিলনমেলা। তবে এবারের ৮১তম অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ, সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। গত ৮ সেপ্টেম্বর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়েছে ৮ সেপ্টেম্বর। আর ২২ সেপ্টেম্বর থেকে নিউইয়র্কে শুরু হচ্ছে বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’ বা আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন সামলানো এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ গড়ে তোলা।
খলিলুর রহমানের এই দায়িত্ব পাওয়া বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়, তবে বিরল ঘটনা। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন। চার দশক পর আবারও বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি এই দায়িত্ব পেলেন।
এবারের নির্বাচনটি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। গত ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে গোপন ব্যালটে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে খলিলুর রহমান পান ৯৯ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস এস কাকুরিস পান ৯১ ভোট। মোট ১৯০টি ভোট পড়ে এবং কোনো ভোট বাতিল বা বিরত ছিল না। জাতিসংঘের আঞ্চলিক পালাবদলের নিয়ম অনুযায়ী এবারের সভাপতির পদটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ছিল।
সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর খলিলুর রহমান বলেছিলেন, তিনি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন, ঐকমত্য সৃষ্টি এবং মতপার্থক্যের মধ্যেও আলোচনার ক্ষেত্র তৈরিতে কাজ করতে চান। জাতিসংঘ জানিয়েছে, তাঁর সভাপতিত্বে ছয়টি বিস্তৃত বিষয় অগ্রাধিকার পাবে—শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি, জলবায়ু ও পরিবেশ, মানবাধিকার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ উদীয়মান প্রযুক্তির শাসন এবং জাতিসংঘের সংস্কার।
৮ সেপ্টেম্বর নতুন অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানান। তাঁর কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং সংলাপ ও ঐকমত্য তৈরির দক্ষতার কথা উল্লেখ করে গুতেরেস বলেন, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা পুনর্গঠন বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
এবারের সাধারণ পরিষদ এমন এক সময়ে বসছে, যখন বিশ্ব একাধিক যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, সুদানের যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা—এসব বিষয় উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়াও এই অধিবেশনের সময় গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠবে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের দায়িত্ব মূলত অধিবেশনের কার্যক্রম পরিচালনা, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও ঐকমত্য তৈরিতে সহায়তা এবং সাধারণ পরিষদের কাজকে এগিয়ে নেওয়া। এই পদে থেকে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় প্রতিনিধি হিসেবে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারবেন না; বরং ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা থাকে। সাধারণ পরিষদে প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের একটি করে ভোট রয়েছে এবং অধিকাংশ প্রস্তাব আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়।
তবে বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দায়িত্বের কূটনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ সংস্কার, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন অর্থায়ন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থের মতো বিষয়ে বাংলাদেশের একজন কূটনীতিক পুরো অধিবেশনের সভাপতিত্ব করছেন। নির্বাচিত হওয়ার পর খলিলুর রহমানও উন্নয়নশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ, জলবায়ু কার্যক্রম এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে কার্যকর করার বিষয়গুলো সামনে রাখার কথা বলেছেন।
ফলে এবারের ৮১তম সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের জন্য শুধু বিশ্বনেতাদের আরেকটি বার্ষিক সমাবেশ নয়। চার দশক পর বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে থেকে অধিবেশন পরিচালনা করছেন—আর সেই দায়িত্ব এসেছে ৯৯-৯১ ভোটের একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।

