দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি হিসেবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতকে দেখছে মধুমতি ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সফিউল আজম বলেছেন, তাঁদের লক্ষ্য শুধু উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়া নয়, বরং ব্যবসার পুরো যাত্রাপথে প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সহায়তা দিয়ে টেকসই উদ্যোক্তা তৈরি করা।
মো. সফিউল আজম বলেন, প্রান্তিক ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া, দ্রুত ও সহজ প্রক্রিয়ায় অর্থায়ন এবং ব্যবসার ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত আর্থিক সমাধান দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে মধুমতি ব্যাংক। একই সঙ্গে নারী ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগের সঙ্গেও সমন্বয় করে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আর্থিক ব্যবস্থার মূল ধারায় নিয়ে আসতে ‘স্মার্ট এজেন্ট ব্যাংকিং’ সেবাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। দেশের যেসব প্রত্যন্ত এলাকায় প্রচলিত ব্যাংক শাখা পরিচালনা করা কঠিন, সেখানে এজেন্ট বুথের মাধ্যমে সেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
এর মাধ্যমে কৃষিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রবাসী আয় গ্রহণকারীরা আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে হিসাব খোলা, আমানত রাখা এবং পরিষেবা বিল পরিশোধের সুযোগ পাচ্ছেন। সফিউল আজমের দাবি, এ ব্যবস্থার ফলে হাজারো গ্রামীণ নারী ও প্রান্তিক মানুষ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছেন এবং সঞ্চয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদবিহীন লেনদেনও বাড়ছে।
এসএমই ঋণে ঝুঁকি ও খেলাপি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিনি বলেন, শুধু কাগজপত্র দেখে একজন উদ্যোক্তার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। এ কারণে গ্রাহকের ব্যবসার নগদ অর্থপ্রবাহ বা ক্যাশ ফ্লো, লেনদেনের ধরন, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক আচরণ বিবেচনায় নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে ক্রেডিট অ্যাসেসমেন্ট, নিয়মিত তদারকি এবং আগাম সতর্কব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ছোট ঋণের ক্ষেত্রে সঠিক উদ্যোক্তা নির্বাচন, ঋণের অর্থ যথাযথ কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মধুমতি ব্যাংকের এমডি। তাঁর দাবি, ব্যাংকটির এসএমই খাতে খেলাপি ঋণের হার নিয়ন্ত্রিত ও সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে।
বড় করপোরেট ঋণের পাশাপাশি এসএমই ও খুচরা ঋণের মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে ব্যাংকটি। সফিউল আজমের মতে, তিনটি খাতেরই আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য ভারসাম্যপূর্ণ ঋণ পোর্টফোলিও প্রয়োজন।
নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন মধুমতি ব্যাংকের এমডি। তাঁর মতে, দেশের অর্থনীতিতে নারী উদ্যোক্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অর্থায়ন, জামানত এবং আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশের ক্ষেত্রে এখনো তাঁদের বিভিন্ন বাধার মুখে পড়তে হয়।
এই পরিস্থিতিতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষায়িত ঋণ স্কিম চালু রেখেছে মধুমতি ব্যাংক। ব্যাংকটির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঋণ তুলনামূলক সাশ্রয়ী সুদ ও সহজ শর্তে দেওয়া হয়।এর পাশাপাশি ‘মধুমতি বন্ধন’ অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল অনবোর্ডিং সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে একজন নারী উদ্যোক্তা ঘরে বসেই ই-কেওয়াইসির মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্যাংক হিসাব খুলতে পারেন। এতে ব্যাংকের শাখায় গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার প্রয়োজন কমে এবং উদ্যোক্তারা নিজেদের ব্যবসায় বেশি সময় দিতে পারেন।
আগামী দিনে এসএমই ব্যাংকিংকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন সফিউল আজম। তিনি বলেন, তাঁদের লক্ষ্য এসএমই ব্যাংকিংকে সহজ, দ্রুত, তথ্য-উপাত্তনির্ভর ও গ্রাহককেন্দ্রিক করা। উদ্যোক্তাকে যেন ঋণের জন্য অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এ জন্য তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকের শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের মধ্যে সমন্বয় আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে উদ্যোক্তাদের কাছে দ্রুত ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তিনি।
ভবিষ্যতের এসএমই ব্যাংকিং সম্পর্কে সফিউল আজম বলেন, এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য, যেখানে উদ্যোক্তাকে ব্যাংকের কাছে আসার অপেক্ষায় থাকতে হবে না; বরং প্রযুক্তি ও তথ্যের মাধ্যমে ব্যাংকই উদ্যোক্তার প্রয়োজন আগে থেকে বুঝতে পারবে।
একই সঙ্গে প্রান্তিক ব্যবসাগুলোর ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং সহজ করতে ফিনটেক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে মধুমতি ব্যাংকের। ব্যাংকটির লক্ষ্য, ঋণ বিতরণের মধ্যেই এসএমই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও ব্যাংকিং সেবার সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উদ্যোক্তা তৈরি করা।

