ইরান যুদ্ধ ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চললেও বিশ্ববাজারে এখনো বড় ধরনের জ্বালানি তেলসংকট দেখা দেয়নি। যুদ্ধের শুরুতে হরমুজ প্রণালি ঘিরে যে ভয়াবহ সরবরাহ–সংকটের আশঙ্কা করা হয়েছিল, বিকল্প পরিবহনপথ, বিভিন্ন দেশের মজুত তেল এবং বিশ্বজুড়ে চাহিদা কমে যাওয়ায় সেই পরিস্থিতি আপাতত সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, এই ভারসাম্য অত্যন্ত নড়বড়ে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তেলের বাজারে বড় ধরনের ধাক্কার ঝুঁকিও তত বাড়বে।
যুদ্ধের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেলের সরবরাহ কমেছে। এত বড় ঘাটতির পরও বাজার পুরোপুরি ভেঙে না পড়ার অন্যতম কারণ তেলের চাহিদা কমে যাওয়া। যুদ্ধ চলাকালে বিশ্বজুড়ে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল কমেছে। ভ্রমণ হ্রাস, গণপরিবহন ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং অনেক প্রতিষ্ঠানের আবার বাড়ি থেকে কাজের ব্যবস্থা চালুর কারণে জ্বালানির ব্যবহার কমেছে।
তেলের বাজার সচল থাকার আরেকটি বড় কারণ হরমুজ প্রণালির বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা। সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল এমন বন্দরে পাঠাচ্ছে, যেগুলো ইরানের সরাসরি নাগালের বাইরে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক পাহারায় হরমুজ দিয়েও তেলবাহী জাহাজ চলাচল করছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল, গায়ানা ও কানাডা সম্মিলিতভাবে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন বাড়িয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ার একটা অংশ অন্য অঞ্চল থেকে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে ইয়েমেন পরিস্থিতি। ইরান-সমর্থিত হুতিদের সাম্প্রতিক বিজয়ের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প তেল পরিবহনপথগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব পথে নতুন করে বড় ধরনের হামলা হলে বর্তমান সরবরাহব্যবস্থা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বিভিন্ন দেশের তেলের মজুতও। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নিজেদের মজুত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ব্যবহার করছে। কিন্তু এখানেই ভবিষ্যতের অন্যতম বড় ঝুঁকি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে একপর্যায়ে এসব মজুত কমে আসবে। তখন বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার কুশিংয়ে গত জুলাইয়ে তেলের মজুত পরিচালনাগত ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। পরে কিছুটা বাড়লেও পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগমুক্ত নয়। অন্যদিকে চীনের সরকারি মজুতের সঠিক পরিমাণ প্রকাশ করা না হলেও ধারণা করা হয়, দেশটির কাছে প্রায় ১০০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসেও রয়েছে ভিন্নতা। জেপি মরগানের হিসাবে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম শেষ পর্যন্ত ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৭ ডলারে স্থিতিশীল হতে পারে। আর যুদ্ধ শেষ হলে তা নেমে আসতে পারে প্রায় ৬৪ ডলারে। অন্যদিকে র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের পূর্বাভাস, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে আগামী বছর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৯ ডলার থাকতে পারে।
এই সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে। যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর বার্ষিক জ্বালানি ব্যয় গড়ে প্রায় ৮০০ ডলার বেড়েছে। ফলে তেলের বাজার শুধু জ্বালানি খাতেই নয়, পরিবহন ব্যয় ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতেও চাপ তৈরি করছে।
বর্তমান সরবরাহব্যবস্থায় মার্কিন সামরিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে হরমুজ পার করানো হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অনির্দিষ্টকাল এভাবে সামরিক পাহারা দিয়ে তেল পরিবহন চালু রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতাও সীমাহীন নয়।
এর মধ্যে মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছে, বছরের বাকি সময়জুড়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি সীমিত থাকতে পারে। আরও সতর্ক পূর্বাভাস দিয়েছে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জি। তাদের ধারণা, আগামী বছরের শেষ নাগাদও মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন যুদ্ধের আগের পর্যায়ে ফিরে নাও যেতে পারে।
ফলে বিশ্ববাজার এখন এমন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে যুদ্ধ চলছে, কিন্তু সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিকল্প পথ, মজুত তেল, বাড়তি উৎপাদন এবং কম চাহিদার ওপর ভর করে বাজার টিকে আছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থার কোনোটিই সীমাহীন নয়।
যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে মজুত কমবে, বিকল্প পরিবহনপথ সর্বোচ্চ সক্ষমতায় পৌঁছাবে এবং সামরিক পাহারার ওপর চাপ বাড়বে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় নতুন কোনো বড় হামলা হলে বর্তমান নড়বড়ে ভারসাম্য দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে। তখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বড় ধরনের উল্লম্ফনের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


