‘আমি ছেলেবেলায় কৃষ্ণনগরেই বাস করতুম সাড়ে এগারো মাস আর হরিপুরে পনেরো দিন।
কিন্তু হরিপুর আমরা সঙ্গেই এনেছিলুম, তার মানসিক আবহাওয়াও।’
নিজের আত্মকথায় পৈতৃক নিবাস হরিপুরের স্মৃতি এভাবেই তুলে ধরেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল ও চলিত গদ্যরীতির রূপকার প্রমথ চৌধুরী। পাবনার চাটমোহরের সেই হরিপুর এবং তার আশপাশের জনপদে সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। হারিয়েছে পুরোনো জৌলুশের অনেকটাই। কিন্তু ইতিহাসের চিহ্ন এখনো ছড়িয়ে আছে এখানকার পুরোনো ভবন, বাজার, নদ ও মানুষের জীবনযাত্রায়।
বৃহত্তর চলনবিলের কোল ঘেঁষে এবং বড়াল নদের তীরে গড়ে ওঠা চাটমোহরের ইতিহাসের সঙ্গে বাণিজ্যের সম্পর্ক বহু পুরোনো। আর সেই বাণিজ্যিক ইতিহাসের অন্যতম কেন্দ্র চাটমোহর পুরাতন বাজার। একসময় বড়াল নদের ঘাটে বড় বড় কার্গো লঞ্চ ও পালতোলা মহাজনি নৌকা ভিড়ত। এখন নদে পলি জমেছে, চারপাশে উঠেছে ইট-পাথরের ভবন। তারপরও বাজারের ব্যস্ততা ও পুরোনো স্থাপনা অতীতের স্মৃতি বহন করে চলেছে।
ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, প্রাচীনকাল থেকেই চলনবিল অঞ্চল ছিল গুরুত্বপূর্ণ জনবসতি। চাটমোহরের বর্তমান বাণিজ্যিক কাঠামো গড়ে উঠতে শুরু করে পঞ্চদশ শতাব্দীতে। ধান, পাট, খেসারি ডাল, তিল ও মরিচসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের কেনাবেচায় এটি একসময় চলনবিল অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়।
চাটমোহর নামের উৎপত্তি নিয়েও স্থানীয়ভাবে একটি জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। নদীপথে ডাকাতির ভয়ে দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা স্বর্ণমুদ্রা বা ‘মোহর’ চটের থলিতে লুকিয়ে হাটে নিয়ে আসতেন। চটের থলিতে মোহর বহন ও লেনদেনের সেই প্রচলন থেকেই কালক্রমে ‘চাটমোহর’ নামটি এসেছে বলে স্থানীয় জনশ্রুতি রয়েছে।
পুরাতন বাজারের বিকাশে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী তিলি বা কুণ্ডু সম্প্রদায়ের বড় ভূমিকা ছিল। ব্রিটিশ আমলে নাটোর, পাবনা, ফরিদপুর ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ মোকাম হিসেবেও ব্যবহৃত হতো বাজারটি।
সত্তরোর্ধ্ব স্থানীয় বাসিন্দা মো. হাশেম আলীর স্মৃতিতেও রয়েছে বড়াল নদের সেই কর্মচঞ্চল সময়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ বছর আগেও বড়াল নদে কার্গো লঞ্চ আসতে দেখা যেত। ৩০০ থেকে ৪০০ মণ মাল বহন করতে সক্ষম বড় নৌকাও তৈরি হতো স্থানীয় ঘাটে।
স্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী শ্রী জয়দেব কুণ্ডুর ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারে এখনো প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো ভবন রয়েছে। একসময় কৃষ্ণদাস কুণ্ডু, সতীশ সাহা, রঘুনাথ কুণ্ডু ও শিরিষ সাহার মতো ব্যবসায়ীরা এখানে ভুসিমাল, গম, যব, চিনা ও কাউনের বড় ব্যবসা পরিচালনা করতেন। নদীপথে এসব পণ্য চলে যেত চাঁদপুর পর্যন্ত।
দেশভাগ ও পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই ভারতে চলে যান। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় মুসলিমসহ অন্য ব্যবসায়ীরা ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন।
পুরাতন বাজারের ব্যবসায়ীদের জনকল্যাণমূলক কাজের একটি নিদর্শন ১৯২৯ সালে নির্মিত ‘চাটমোহর দাতব্য চিকিৎসালয় গৃহ’। পাবনা ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান মৌলভি ওয়াসিমুদ্দিন আহম্মাদ বাহাদুর ও ভাইস চেয়ারম্যান এ এম আবদুল হামিদের পৃষ্ঠপোষকতায় এটি নির্মিত হয়। নির্মাণে কুণ্ডু পরিবারের একাধিক ব্যবসায়ী এবং হরিপুরের জমিদার ক্ষিতীশচন্দ্র চৌধুরী আর্থিক সহায়তা করেছিলেন।
চাটমোহরের যোগাযোগ ও বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন আসে ১৯১৫-১৯১৬ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেললাইন নির্মাণের পর। রেলপথে কলকাতাসহ বৃহত্তর বাংলার বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়। বর্তমানে বড়াল নদের নাব্যতা কমে গেলেও সড়ক ও রেল যোগাযোগের কারণে বাজারটির বাণিজ্যিক গুরুত্ব ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
হালনাগাদ স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, চাটমোহর পৌরসভায় প্রায় দুই হাজার ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে। পৌর এলাকার ১ হাজার ৫২৫টি দোকানের মধ্যে প্রায় এক হাজারই পুরাতন বাজারে। খুচরা ও পাইকারি—দুই ধরনের ব্যবসারই বড় কেন্দ্র এটি।
চাটমোহর পুরাতন বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. জিয়ারুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, হান্ডিয়াল, ছাইকোলা ও নিমাইচড়াসহ চলনবিলের বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের উৎপাদিত ধান, পাট ও শীতকালীন সবজির গুরুত্বপূর্ণ মোকাম এখনো এই বাজার। তাঁর দাবি, বাজারটিতে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়। তবে অবকাঠামোগত সমস্যা এখনো রয়েছে।
পুরোনো ব্যবসার পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে বাজারের পণ্যের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় যেখানে ধান-পাটই ছিল প্রধান, এখন সেখানে উচ্চমূল্যের ফলসহ নতুন ধরনের কৃষিপণ্যও আসছে। একই সঙ্গে শত বছরের পুরোনো মিষ্টির ব্যবসাও টিকে রয়েছে। মনমোহন মিষ্টান্ন ভান্ডারের বর্তমান স্বত্বাধিকারী শ্রী কমল কুমার পালের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় জমিদার ও বড় মহাজনেরা তাঁদের প্রধান ক্রেতা ছিলেন। এখন অনলাইনের মাধ্যমেও ঢাকা থেকে অর্ডার আসে।
চাটমোহরের পরিচয় শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসেও অঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। প্রমথ চৌধুরীর পৈতৃক ভিটা হরিপুর গ্রাম এখানেই। তাঁর সম্পাদনায় ১৯১৪ সালে প্রকাশিত সবুজ পত্র বাংলা গদ্যসাহিত্যে চলিত ভাষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই অঞ্চলের অধ্যক্ষ এম এ হামিদ চলনবিলের ইতিকথা গ্রন্থে চলনবিলের ইতিহাস ও সমাজজীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন।
এ অঞ্চলের আরেকটি ঐতিহাসিক নিদর্শন চাটমোহর শাহি মসজিদ। ১৫৮১ সালে মোগল আমলে নির্মিত এই স্থাপনাও চাটমোহরের দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।
তবে যে বড়াল নদ একসময় এই বাজারের বাণিজ্যের প্রাণ ছিল, সেই নদ এখন নাব্যতা হারিয়ে সংকটে পড়েছে। স্লুইসগেট, দখলসহ বিভিন্ন কারণে নদটির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বড়াল রক্ষায় স্থানীয় মানুষ ও ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে আন্দোলনও গড়ে উঠেছে। কিছু বাঁধ অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কুমারগাড়া গ্রামে নদতীরে গড়ে উঠেছে পরিবেশবান্ধব বড়াল বিদ্যানিকেতন।
চাটমোহর পুরাতন বাজারের অলিগলিতে তাই একই সঙ্গে ধরা পড়ে অতীত ও বর্তমান। চটের থলিতে স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে ব্যবসায়ীদের হাটে আসার দিন আর নেই, বড়ালেও আগের মতো বিশাল নৌকা ভেড়ে না। কিন্তু চলনবিলের কৃষিপণ্য, শত বছরের ব্যবসায়িক ঐতিহ্য এবং হাজারো মানুষের জীবিকার কেন্দ্র হিসেবে পুরাতন বাজার এখনো সচল। নদ ও বাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই ইতিহাস সংরক্ষণ করতে পারলে চাটমোহরের শত বছরের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে টিকে থাকবে।


