মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অশান্তির মধ্যেও সৌদি আরব নিজেদের একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরেছিল। তবে সম্প্রতি দেশটির রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের প্রাণঘাতী হামলা সেই নিরাপত্তার অনুভূতিতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। এ ঘটনার পর দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী পরিবারগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে।
গত শনিবার কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের চালানো হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরবর্তীতে টানা তিন দিন ধরে রিয়াদের পাশাপাশি পূর্বাঞ্চলীয় তেল স্থাপনা এবং দাম্মাম বিমানবন্দরেও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে বিদ্রোহীরা। চলতি বছরের শুরুতে সানা বিমানবন্দরে সৌদি হামলার পাল্টা জবাব হিসেবেই এই আক্রমণ চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে হুতি গোষ্ঠী। বিমানবন্দরের ভেতরে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ছাদ ধসে পড়া এবং ওমরাহযাত্রীদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দিকবিদিক ছোটাছুটির সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়তেই সাধারণ নাগরিকদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তাৎক্ষণিক প্রাণহানির বাইরেও এই হামলা সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, পর্যটন এবং মেগা অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলোর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে। এমন এক সময়ে এই আঘাত এলো যখন আর মাত্র দুই সপ্তাহ পর দেশটিতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ সম্মেলন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে বহির্বিশ্বের সামনে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখার যে বার্তা রিয়াদ দিয়ে আসছিল, তা বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ল।
এই পরিস্থিতির জেরে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসে রিয়াদে বসতি গড়া প্রবাসী পরিবারগুলো এখন নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক বিমানবন্দরে এমন আঘাত হানায় সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা। এমনকি স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং হামলার ধারাবাহিকতা তাঁদের মধ্যে ভীতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদে এই হামলা সৌদি আরবের উচ্চাভিলাষী রূপকল্প ‘ভিশন ২০৩০’-এর জন্যও এক বড় ধাক্কা। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশকে তেলনির্ভরতা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বাণিজ্যের কেন্দ্রে রূপান্তরের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা আঞ্চলিক সংঘাতের মুখে নাজুক হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের “সৌদি আরব নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম” মন্তব্য এবং ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশায় ক্ষুব্ধ উপসাগরীয় মিত্ররা। ফলে রিয়াদ এখন আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের সাথে নতুন জোট গঠনের মাধ্যমে নিজের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

