গাজীপুরে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। গত ২০ দিনে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন চার শতাধিক মানুষ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে গাজীপুর মহানগর এলাকায়। মৃত্যুর দিক থেকেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কোনাবাড়ীতে, যেখানে ১৩ জনের মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর মহানগরীর পাশাপাশি কালিয়াকৈরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়েছে। এছাড়া কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ ও শ্রীপুর উপজেলায়ও নিয়মিত ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমান জানিয়েছেন, মহানগর ও কালিয়াকৈরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতায় আনার পাশাপাশি পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
রোগীর সংখ্যা বাড়ায় চাপ তৈরি হয়েছে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও। হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। রোগীর চাপ বেশি থাকায় কখনো কখনো শয্যার সংকট দেখা দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু রোগীকে হাসপাতালের মেঝে কিংবা করিডোরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবদুস সালাম সরকার জানিয়েছেন, ডেঙ্গু রোগীর চাপ আগের তুলনায় বেড়েছে। প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। একই সঙ্গে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে অনেকে বাড়িতেও ফিরছেন। বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানান তিনি।
এদিকে ডেঙ্গুর এমন পরিস্থিতির জন্য মশকনিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের ঘাটতিকে দায়ী করছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে। তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন পানি জমে থাকলেও নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছে না। বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জায়গা ও বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে কোনাবাড়ীসহ মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনায় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। শিশু-কিশোরদের নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অভিভাবকেরা। স্থানীয়দের দাবি, শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেই হবে না, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে নিয়মিত ও সমন্বিত কার্যক্রম চালাতে হবে।
তবে গাজীপুর সিটি করপোরেশন বলছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশকনিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাক জানিয়েছেন, নিয়মিত মশার লার্ভা শনাক্ত করা, প্রজননস্থল পরিষ্কার এবং প্রয়োজনীয় জায়গায় ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস ইসরায়েলেনসিস বা বিটিআই প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ওয়ার্ডে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শওকত হোসেন সরকারও জানিয়েছেন, মশার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে ওষুধ প্রয়োগের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, ফুলের টব ও পরিত্যক্ত পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি অপসারণের মাধ্যমে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ কমানো সম্ভব।
গাজীপুরের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য এলাকাতেও চলতি বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে গাজীপুরে অল্প সময়ের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যু এবং চার শতাধিক মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

