দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে রাজধানীতে গণজমায়েত করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। সংগঠনটির দাবি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের হামলার প্রতিবাদ, জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। বুধবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুরু হওয়া কর্মসূচি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় ছাত্রশিবিরের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পরে তারা মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান নেন। সেখানে আয়োজিত সমাবেশে সংগঠনটির বর্তমান ও সাবেক নেতারা বক্তব্য দেন। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া অনেক নেতা-কর্মীর হাতে পাইপও দেখা যায়, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সমাবেশে বক্তারা সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষের জন্য ছাত্রদলকে দায়ী করেন এবং সরকারের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবারও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলছে, যা শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশকে ব্যাহত করছে।
সমাবেশে বক্তব্য দেন পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি বলেন, ৫ আগস্টকে বিজয়ের দিন হিসেবে উদ্যাপনের কথা থাকলেও বাস্তবে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে হচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য দুঃখজনক। তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্রদলের কর্মকাণ্ড বিএনপির জন্যও নেতিবাচক বার্তা বহন করছে। একই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ছাত্রদলকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অতীতে ছাত্রলীগ যেভাবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়েছিল, ছাত্রদলও তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। তাঁর এই বক্তব্য সমাবেশে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম বুলবুলও সমাবেশে বক্তব্য দেন। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে ছাত্রলীগ যে ধরনের ক্যাম্পাস-রাজনীতির চর্চা করেছে, এখন ছাত্রদলও একই পথে হাঁটছে। তাঁর দাবি, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হল দখল ও আধিপত্য বিস্তারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ছাত্রসমাজকে সঙ্গে নিয়ে ইসলামী ছাত্রশিবির যেকোনো ধরনের সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও গণভোটের আকাঙ্ক্ষাকে দুর্বল করার জন্য পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র চলছে এবং সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গণরায়ের পূর্ণ বাস্তবায়ন জরুরি।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান। তিনি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় কিছু পুলিশ সদস্যও সহযোগিতার ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর দাবি, যেসব পুলিশ কর্মকর্তা হামলায় সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় জনগণের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হবে যে হামলার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।
সমাবেশের সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, জুলাই বিপ্লবের সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক সুবিধা বিএনপি পেলেও ক্ষমতায় আসার পর গণহত্যার বিচার কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। তাঁর দাবি, দুই বছর পার হলেও মাত্র কয়েকটি মামলার রায় হয়েছে এবং কোনো রায় কার্যকর হয়নি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবারও হল দখল, গণরুম এবং গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ছাত্রদলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যদি তাদের নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তাহলে ছাত্রশিবির নিজেদের উদ্যোগেই প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। তাঁর ভাষায়, শিক্ষাঙ্গনে ভয়ভীতি বা সন্ত্রাসের মাধ্যমে কোনো সংগঠন আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না। তিনি দাবি করেন, ছাত্রশিবির শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাইলেও প্রয়োজন হলে তারা প্রতিরোধে নামতে প্রস্তুত।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং উত্তেজনার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও বাড়ছে। একদিকে ছাত্রশিবির ছাত্রদলের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ তুলছে, অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন ঘটনায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ক্যাম্পাসে সহিংসতা বন্ধ করে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম বজায় রাখতে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সংযম এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হলে উত্তেজনা প্রশমনে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।


