পাকিস্তানের একঝাঁক সাবেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড বা পিসিবি। আফ্রিকার দেশ জাম্বিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য ‘এশিয়ান লেজেন্ডস লিগ’-এ অংশ নেওয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এই বিতর্ক। অভিযোগ, বোর্ডের প্রয়োজনীয় অনুমতি বা অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ছাড়াই কয়েকজন সাবেক ক্রিকেটার এই টুর্নামেন্টে খেলার চুক্তি করেছেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই নড়েচড়ে বসেছে পিসিবি। বোর্ড স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নিয়ম ভেঙে অননুমোদিত লিগে অংশ নেওয়া ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে দুই বছর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞাসহ একাধিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
ঘটনার সূত্রপাত গত সপ্তাহে, যখন জাম্বিয়া ক্রিকেট ইউনিয়ন বা জেডসিইউ এক বিবৃতিতে জানায়, ‘এশিয়ান লেজেন্ডস লিগ’ তাদের অনুমোদিত, স্বীকৃত বা সমর্থিত কোনো প্রতিযোগিতা নয়। আয়োজকদের দাবি এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে এই অসঙ্গতি প্রকাশ্যে আসতেই বিষয়টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়। এরপরই পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়।
পিসিবি বলেছে, বোর্ডের অনুমতি ছাড়া কোনো বর্তমান বা সাবেক ক্রিকেটারের বিদেশি টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া নিয়মবহির্ভূত। এ ধরনের ঘটনায় তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পদক্ষেপ নেবে। বোর্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্রিকেটের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও আন্তর্জাতিক নিয়ম বজায় রাখতেই এই কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
পিসিবির ঘোষিত শাস্তির তালিকাও বেশ কঠোর। বোর্ড জানিয়েছে, যেসব ক্রিকেটার প্রয়োজনীয় এনওসি ছাড়াই এই লিগে অংশ নেবেন, তাঁদের দুই বছরের জন্য অনুমোদিত বিদেশি ক্রিকেট লিগে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হবে না। পাশাপাশি এই সময়ের মধ্যে তারা পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড কিংবা পাকিস্তান সুপার লিগ—পিএসএলের অধীনে কোচ, মেন্টর, পরামর্শক বা অন্য যেকোনো দায়িত্ব পালনেও অযোগ্য বিবেচিত হবেন। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু একটি টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব তাঁদের ভবিষ্যৎ ক্রিকেট-সম্পৃক্ত ক্যারিয়ারেও পড়তে পারে।
ক্রিকেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ক্রিকইনফো জানিয়েছে, পিসিবির দৃষ্টিতে নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনাটি ইতোমধ্যেই সংঘটিত হয়েছে। কারণ, ৩০ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্বকারী ‘পাকিস্তান প্যানথার্স’ দল ইতোমধ্যে দুটি ম্যাচ খেলেছে। ফলে বোর্ড মনে করছে, তদন্তের জন্য অপেক্ষা না করে শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া শুরু করার যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ হাফিজ, সাবেক অলরাউন্ডার সোহেল তানভীর এবং উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান উমর আকমল এই লিগে অংশ নেওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁরা খেলার উদ্দেশ্যে জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকায়ও পৌঁছান। তবে সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, টুর্নামেন্টটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বা আইসিসির প্রয়োজনীয় অনুমোদন পায়নি। এরপর তাঁরা প্রতিযোগিতায় না খেলার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও আরও বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সাবেক ক্রিকেটার এই লিগে অংশ নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এশিয়ান লেজেন্ডস লিগে অংশ নেওয়া দলগুলোর তালিকায় রয়েছে পাকিস্তান প্যানথার্স, ইন্ডিয়ান রয়্যালস, শ্রীলঙ্কান লায়নস, বাংলাদেশ টাইগার্স, আফগানিস্তান পাঠানস এবং এশিয়ান স্টারস। আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী, এই প্রতিযোগিতায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সাবেক ক্রিকেটাররা অংশ নিচ্ছেন। তবে এখন পর্যন্ত অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে কেবল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডই আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছে এবং শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
পিসিবি তাদের বিবৃতিতে আরও বলেছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়মকানুন অক্ষুণ্ন রাখা এবং খেলাটির সুশাসন নিশ্চিত করা তাদের অন্যতম দায়িত্ব। বোর্ডের মতে, কোনো বিদেশি লিগে অংশ নেওয়ার আগে বর্তমান কিংবা সাবেক—সব ক্রিকেটারকেই যথাযথ অনুমোদন এবং অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করতে হবে। এই নিয়ম অমান্য করলে তা ক্রিকেট প্রশাসনের জন্য নেতিবাচক নজির তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাবেক ক্রিকেটারদের নিয়ে লেজেন্ডস লিগ আয়োজনের প্রবণতা বেড়েছে। তবে এসব টুর্নামেন্টের সবগুলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বা সংশ্লিষ্ট জাতীয় বোর্ডের অনুমোদন পায় না। ফলে অনেক সময় ক্রিকেটাররা না বুঝেই এমন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতায় পড়েন। পিসিবির সাম্প্রতিক অবস্থান অন্য বোর্ডগুলোর জন্যও একটি বার্তা হতে পারে যে, অননুমোদিত টুর্নামেন্টের বিষয়ে ভবিষ্যতে আরও কঠোর নজরদারি করা হবে।
এখন নজর থাকবে, পিসিবি শেষ পর্যন্ত কারা এই নিয়ম ভঙ্গ করেছেন বলে চিহ্নিত করে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়। একই সঙ্গে এই বিতর্কের পর এশিয়ান লেজেন্ডস লিগের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।


