মিচেল স্টার্কের বিধ্বংসী বোলিংয়ে বাংলাদেশকে মাত্র ৬৪ রানে গুটিয়ে দিয়ে প্রথম ইনিংসে বড় লিড নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। তবে ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিন শেষে স্বস্তির পাশাপাশি সতর্কও অস্ট্রেলিয়া। কারণ, প্রথম ইনিংস এখনো শেষ হয়নি এবং ম্যাচের ফল নির্ধারণে বাকি রয়েছে আরও অনেক ক্রিকেট।
ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় টেস্ট অভিষেকের দিনটিতে মূলত দাপট দেখিয়েছেন বোলাররা। প্রথম দিনেই দুই দলের ১৮টি উইকেট পড়েছে। বাংলাদেশকে মাত্র ৬৪ রানে অলআউট করার পর অস্ট্রেলিয়া পেয়েছে ১০১ রানের লিড। দিনের শেষে অস্ট্রেলিয়ার হাতে অবশ্য রয়েছে মাত্র ২ উইকেট।
তাই প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে মিচেল স্টার্ককে প্রশ্ন করা হয়েছিল—প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার জন্য কত রান যথেষ্ট হতে পারে? উত্তরে অস্ট্রেলিয়ার বাঁহাতি পেসার মনে করিয়ে দিয়েছেন টেস্ট ক্রিকেটের মৌলিক বাস্তবতা। তাঁর বক্তব্য, অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস এখনো শেষ হয়নি, আর একটি টেস্ট ম্যাচ কেবল একটি ইনিংসে নির্ধারিত হয় না।
স্টার্কের মতে, ম্যাচে এখনো অনেক সময় বাকি এবং টেস্ট ক্রিকেট মূলত দুই ইনিংসের খেলা।
প্রথম দিনেই বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে বিপর্যস্ত করার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল স্টার্কের। মাত্র ১০ ওভার বল করে ১২ রান খরচায় নিয়েছেন ৬ উইকেট। তাঁর বোলিংয়ের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ কার্যত ভেঙে পড়ে।
টেস্টের প্রথম বলেই সাদমান ইসলামকে ফিরিয়ে দিয়ে শুরুটা করেছিলেন স্টার্ক। আর এই উইকেটের মাধ্যমে নতুন একটি রেকর্ডও গড়েছেন তিনি। টেস্ট ক্রিকেটে এখন সবচেয়ে বেশি চারবার প্রথম বলেই উইকেট নেওয়ার কীর্তি এই অস্ট্রেলিয়ান পেসারের।
শুধু প্রথম বলের উইকেট নয়, পুরো ইনিংসেই স্টার্ক ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। বাংলাদেশের ব্যাটারদের ওপর শুরু থেকেই চাপ তৈরি করে একের পর এক উইকেট তুলে নিয়েছেন তিনি। তাঁর বোলিংয়ের গতি, সুইং এবং স্টাম্প লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক লাইন বাংলাদেশকে বড় জুটি গড়ার সুযোগ দেয়নি।
এই দুর্দান্ত স্পেলের মধ্য দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে পেসারদের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারিদের তালিকাতেও আরও ওপরে উঠেছেন স্টার্ক। ডেল স্টেইনকে পেছনে ফেলে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন টেস্ট ইতিহাসের পেসারদের শীর্ষ পাঁচ উইকেটশিকারির তালিকায়।
প্রথম দিনে ১৮ উইকেট পড়ায় ম্যাকাইয়ের উইকেট নিয়েও আলোচনা হয়েছে। অনেকের ধারণা, উইকেটের আচরণই এত দ্রুত ব্যাটিং ধসের মূল কারণ। কিন্তু স্টার্ক সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন।
তাঁর মতে, উইকেট মোটেও খারাপ ছিল না। বরং প্রথম দিনের জন্য এটি ভালো উইকেট ছিল এবং ব্রিসবেনের গ্যাবার উইকেটের সঙ্গে এর আচরণের মিল ছিল। গ্যাবায় প্রথম দিনে যেমন কিছুটা অসমান বাউন্স দেখা যায়, ম্যাকাইয়েও একই ধরনের বাউন্স ছিল বলে মনে করেন তিনি।
অর্থাৎ স্টার্কের চোখে ১৮ উইকেট পড়ার পেছনে উইকেটের চেয়ে বোলারদের কৃতিত্বই বেশি।
নিজের বোলিং পরিকল্পনা নিয়েও স্টার্কের বক্তব্য বেশ সরল। গত ১৫ বছরেও তাঁর মূল পরিকল্পনায় খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। শুরু থেকেই তাঁর লক্ষ্য থাকে দৌড়ে এসে স্টাম্পে আঘাত করা, আক্রমণাত্মক থাকা এবং বল সুইং করলে সেটিকে কাজে লাগানো।
স্টার্কের বোলিং দর্শন মূলত সরাসরি—ব্যাটারের ব্যাটের বাইরের প্রান্ত খোঁজার পাশাপাশি স্টাম্পকে সব সময় খেলায় রাখা। প্রথম বলেই উইকেট পেলে সেই পরিকল্পনা আরও কার্যকর হয়ে ওঠে।
আর প্রথম বলেই সাদমানকে ফেরানোর পর স্টার্কের আত্মবিশ্বাস যে আরও বেড়েছিল, সেটিও তাঁর কথায় স্পষ্ট। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতেই উইকেট পাওয়া মানে সামনে থাকা ১০ উইকেটের মধ্যে আর মাত্র ৯টি নেওয়া বাকি—এই ভাবনাটাই তাঁকে আনন্দ দেয়।
তবে অস্ট্রেলিয়া বড় লিড পেলেও ম্যাচ এখনো শেষ হওয়ার মতো জায়গায় যায়নি। বাংলাদেশের সামনে দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসও এখনো শেষ হয়নি।
সেখানেই স্টার্কের ‘টেস্ট দুই ইনিংসের খেলা’ মন্তব্যের গুরুত্ব। প্রথম দিনে অস্ট্রেলিয়া নিঃসন্দেহে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, কিন্তু পাঁচ দিনের টেস্টে একটি ইনিংসের সাফল্য দিয়ে ম্যাচের পুরো গল্প লেখা যায় না।
বাংলাদেশের জন্য অবশ্য দ্বিতীয় দিনের শুরুটাই হতে পারে ঘুরে দাঁড়ানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ। অস্ট্রেলিয়ার বাকি দুই উইকেট দ্রুত তুলে নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ব্যাটিংয়ে বড় সংগ্রহ দাঁড় করাতে পারলে ম্যাচের চিত্র বদলাতেও পারে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া চাইবে প্রথম ইনিংসে যতটা সম্ভব বড় লিড নিয়ে বাংলাদেশের ওপর আরও চাপ তৈরি করতে। প্রথম দিনের বোলিং পারফরম্যান্স যদি পরের ইনিংসেও ধরে রাখতে পারে তারা, তাহলে ম্যাচ দ্রুত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিন তাই একদিকে স্টার্কের অসাধারণ বোলিংয়ের গল্প, অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ। ৬৪ রানে অলআউট হওয়ার পর ব্যবধান অনেকটাই তৈরি হয়েছে। কিন্তু স্টার্ক নিজেই মনে করিয়ে দিয়েছেন—টেস্ট ক্রিকেটে একটি ইনিংস দিয়ে শেষ কথা বলা যায় না।

