আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর প্রায় ছয় বছর পর তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে চলমান মামলায় সামনে এসেছে নতুন এক তত্ত্ব। টানা ৪৩টি শুনানিতে ৭৬ জন সাক্ষীর বক্তব্য নেওয়ার পর ৪৪তম শুনানিতে ৭৭তম সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির হওয়া ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ পাবলো ফেরারি বলেছেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ম্যারাডোনার মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর ৬০ বছর বয়সে মারা যান ম্যারাডোনা। সে সময় বিশ্বজুড়ে চলছিল কোভিড-১৯ মহামারি। মৃত্যুর সময় আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসের উপকণ্ঠের একটি বাড়িতে চিকিৎসাধীন ছিলেন বিশ্বকাপজয়ী এই কিংবদন্তি।
ম্যারাডোনার মৃত্যুর পর তাঁর চিকিৎসায় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেই সূত্র ধরেই পরবর্তী সময়ে শুরু হয় আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু মামলার আগের ৪৩টি শুনানিতে কোনো সাক্ষীই করোনাভাইরাসকে তাঁর মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সামনে আনেননি। শেষ সাক্ষীর বক্তব্যে প্রথমবারের মতো সেই সম্ভাবনা আদালতের আলোচনায় এসেছে।
সরকারি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক পাবলো ফেরারি আদালতে বলেন, করোনাভাইরাস শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই একজন রোগীর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটাতে পারে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেও পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণেই ম্যারাডোনার ক্ষেত্রে কোভিড-১৯-এর সম্ভাবনা একেবারে বাদ দেওয়া ঠিক হবে না বলে মত দেন ফেরারি। আদালতে তিনি বলেন, ‘আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না যে তিনি কোভিডে মারা গেছেন।’
তাঁর বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। ফেরারির মতে, ম্যারাডোনার ময়নাতদন্তের সময় করোনাভাইরাস শনাক্তে পরীক্ষা না করাটা ছিল একটি ‘পদ্ধতিগত ভুল’। অর্থাৎ সে সময় পরীক্ষা করা হলে তাঁর শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি ছিল কি না, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারত বলে তাঁর বক্তব্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
তবে ফেরারির বক্তব্য ম্যারাডোনা করোনাভাইরাসেই মারা গিয়েছিলেন—এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নয়। তিনি মূলত কোভিড-১৯-কে সম্ভাব্য একটি কারণ হিসেবে বাদ দেওয়া যায় না বলে মত দিয়েছেন। ফলে তাঁর বক্তব্যকে ম্যারাডোনার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নতুন একটি ফরেনসিক তত্ত্ব হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ফেরারির সাক্ষ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ, তিনি এর আগেও ম্যারাডোনার মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের একটি পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৫ সালে মামলার প্রধান আসামি হিসেবে উল্লেখ করা লিওপোলদো লুকের অনুরোধে করা সেই বিশেষজ্ঞ পরীক্ষায় তিনি অংশ নিয়েছিলেন।
ম্যারাডোনার মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর শেষ সময়ের চিকিৎসা ও পরিচর্যা নিয়ে বিতর্ক চলছে। মৃত্যুর আগে তিনি অস্ত্রোপচারের পর বাড়িতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর চিকিৎসাব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল কি না এবং দায়িত্বে থাকা চিকিৎসাকর্মীদের কোনো অবহেলা ছিল কি না—এসব প্রশ্নই মামলার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এর মধ্যে করোনাভাইরাসের সম্ভাবনা সামনে আসায় মৃত্যুর কারণ নিয়ে আলোচনায় নতুন একটি দিক যুক্ত হলো। কারণ, ৭৬ জন সাক্ষীর বক্তব্য শেষ হওয়ার পরও এই সম্ভাবনা সামনে আসেনি। ৭৭তম সাক্ষীর বক্তব্যেই প্রথমবার আদালতে বিষয়টি স্পষ্টভাবে তোলা হলো।
তবে এই নতুন তত্ত্ব ম্যারাডোনার মৃত্যুর প্রতিষ্ঠিত কারণ পরিবর্তন করবে কি না, সেটি নির্ভর করবে আদালতের মূল্যায়ন ও মামলার অন্যান্য ফরেনসিক প্রমাণের ওপর। শুধু একজন বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের ভিত্তিতে করোনাভাইরাসকেই তাঁর মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা ম্যারাডোনার মৃত্যুর প্রায় ছয় বছর পরও তাই তাঁর শেষ সময়ের চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়নি। এবার কোভিড-১৯-এর সম্ভাবনা সামনে আসায় বহুল আলোচিত মামলাটিতে যোগ হলো নতুন এক অধ্যায়।

