ইরানের কাছে পরাজয়ের স্বাদ পেয়ে রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন ইসরাইলের যুদ্ধবাজ নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আর নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া হয়ে এবার তিনি খুঁজছেন নতুন লক্ষ্যবস্তু। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের টার্গেট তুরস্ক। প্রশ্ন উঠেছে — মধ্যপ্রাচ্যে কি তবে নতুন আরেকটি সংঘাতের আগুন জ্বলে উঠতে চলেছে?
ইতিমধ্যেই তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরাইলি আগ্রাসনের ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটির অন্যতম প্রাচীন দৈনিক হারেৎজ। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছেন নেতানিয়াহু। যদি বাস্তবিকই এমনটা ঘটে, তাহলে শুধু তুরস্ক নয়, এই আগুনের আঁচ লাগতে পারে প্রতিবেশী সিরিয়া, গাজা, লেবানন এমনকি পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত। এমন পরিস্থিতিতে ইসরাইলকে জবাব দিতে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বিভিন্ন সশস্ত্র প্রক্সি গোষ্ঠীও। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই সম্ভাব্য সংঘাতের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে তুরস্কের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী সিরিয়া।
এক সময় বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে ইসরাইলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত ছিল তুরস্ক। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৪৯ সালে ইসরাইলকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছিল তারা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পুরনো বন্ধুত্বে ধরেছে গভীর ফাটল। চলতি বছর তিন ডজনেরও বেশি দেশে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, ইসরাইল বিরোধী মনোভাবের শীর্ষে রয়েছে তুরস্কের অবস্থান।
ইসরাইলের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষিতে গত বছর থেকেই কঠোর সতর্ক অবস্থানে আছে তুরস্ক। পাল্টা হুঁশিয়ারি দিতেও পিছপা হননি দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান। তিনি ইসরাইলি কর্মকাণ্ডকে স্রেফ গুন্ডামি বলে আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেছেন, দখলদার ইসরাইলের মূল উদ্দেশ্যই হলো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করা। গত বুধবার তুরস্কের পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে এরদোয়ান দাবি করেন, লেবানন ও সিরিয়ার সংকটকালীন পরিস্থিতি তুরস্কের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের অধিকার লঙ্ঘনের জোরালো চেষ্টা চালাচ্ছে ইসরাইল।
এরদোয়ান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত তুরস্ক। তার ভাষায়, বিশ্ব নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে ইসরাইলের লাগাতার আগ্রাসন বন্ধ করতেই হবে। ইতিমধ্যেই ইসরাইলের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বন্ধ রেখেছে তুরস্ক। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আদালতের কাছে ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছে দেশটি।
এরদোয়ানের এমন মন্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই চটেছেন নেতানিয়াহু। তিনি তুর্কি প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন, এমনকি এরদোয়ানকে ইহুদি বিদ্বেষী স্বৈরশাসক বলেও আখ্যা দিয়েছেন। তবে এত কিছুর মধ্যেও নিজেদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ।
যদি সব আশঙ্কাকে সত্যি করে সত্যিই সংঘাতে জড়ান এরদোয়ান এবং নেতানিয়াহু, তাহলে শুরু হতে পারে ড্রোন আর মিসাইল যুদ্ধের একেবারে নতুন এক অধ্যায়। এমন পরিস্থিতিতে কঠিন কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র হওয়ায় এই সংঘাত জোটের অভ্যন্তরেই তৈরি করতে পারে বিভক্তি। এমনকি ইউরোপীয় দেশগুলোও তাদের অবস্থান নিয়ে পড়তে পারে গভীর দ্বিধায়। আর স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়বে গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও, যা বয়ে আনতে পারে এক বড় ধাক্কা।



