কুমিল্লার দেবীদ্বার পৌর এলাকার ছোট আলমপুরে ফরিদা ইয়াসমিন নামের ৫০ বছর বয়সী এক নারীকে হত্যার পর তাঁর মরদেহ টুকরা করে পলিথিনে মুড়িয়ে ৯টি প্যাকেটে রাখার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার সন্ধ্যায় বাড়ির পেছন থেকে এসব প্যাকেট উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় লাইলী আক্তার নামের এক ভাড়াটিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার করা প্যাকেটগুলোতে ফরিদা ইয়াসমিনের খণ্ডিত মরদেহের বিভিন্ন অংশ ছিল। তবে এখনো তাঁর মাথা ও পায়ের অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় নিহত নারীর স্বামী মফিজুল ইসলাম বাদী হয়ে দেবীদ্বার থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় লাইলী আক্তারসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার লাইলী আক্তারের বিরুদ্ধে এর আগেও একটি শিশুহত্যা মামলার অভিযোগ ছিল। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ৭ নভেম্বর দেবীদ্বার এলাকায় সাত বছর বয়সী ফাহিমা নামের এক শিশুকে হত্যার ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
ওই মামলায় লাইলীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। মামলার এজাহার ও তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, শিশুটি তার বাবা আমির হোসেনের সঙ্গে লাইলী আক্তারের অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি দেখে ফেলেছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর শিশুটিকে হত্যা করে বস্তাবন্দী করে কাচিসাইর পুলের নিচে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পর ১৪ নভেম্বর বস্তাবন্দী অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।
শিশুহত্যার ওই মামলায় গ্রেপ্তারের পর লাইলী আক্তার দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবার দেবীদ্বার পৌর এলাকার চাপানগরে বসবাস শুরু করেন। এরপর গত ১ আগস্ট তিনি ফরিদা ইয়াসমিনের বাড়ির একটি টিনের ঘর ভাড়া নেন।
পুলিশের দাবি, ফরিদা ইয়াসমিন হত্যার ঘটনায় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে লাইলী আক্তার জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আরও চারজনের নাম বলেছেন। তবে ওই চারজনের হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হয়নি। তাঁদের ভূমিকা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান মালামাল লুটের উদ্দেশ্যে ফরিদা ইয়াসমিনকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
নিহত ফরিদা ইয়াসমিনের পারিবারিক পরিস্থিতিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর স্বামী মফিজুল ইসলাম জাহাজে চাকরি করেন। তাঁদের দুই মেয়ে রাবেয়া বসরী ও মরিয়ম আক্তারের বিয়ে হয়ে গেছে। ফলে ফরিদা ইয়াসমিন বাড়িতে একাই থাকতেন।
বাড়িতে একা থাকার সুযোগ নিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ কীভাবে খণ্ডিত করা হলো, কারা এতে সহযোগিতা করেছে এবং মরদেহের বাকি অংশ কোথায় রাখা হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তদন্ত চলছে।
দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, পলিথিনে মোড়ানো ফরিদা ইয়াসমিনের খণ্ডিত মরদেহের ৯টি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মরদেহের মাথা ও পায়ের অংশ এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
ঘটনার পর পুলিশ মরদেহের উদ্ধার হওয়া অংশগুলো জব্দ করে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করেছে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার লাইলী আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
এদিকে কয়েক বছর আগে শিশুহত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একজন ব্যক্তি জামিনে মুক্তির পর নতুন করে এমন একটি হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে আগের মামলার সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনো সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
বর্তমানে মামলাটির তদন্তে হত্যার উদ্দেশ্য, সহযোগীদের পরিচয়, লুট হওয়া মালামালের তথ্য এবং মরদেহের অনুদ্ঘাটিত অংশ উদ্ধারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

