সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে খুব শিগগিরই। নবম বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণার প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। কাজ শেষ হলেই তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলেই শুরু হবে প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে প্রধান করে গঠিত হয় ১০ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিবসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি রয়েছেন এই কমিটিতে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কমিটি ইতিমধ্যে তাদের সুপারিশ প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল তথা আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি ঢাকা সফর করে গেছে এবং অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছে। এই বৈঠকে সংস্থাটি রাজস্ব আহরণে জোর দেওয়ার পরামর্শ দেয় এবং নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য অর্থের সংস্থান কোথা থেকে আসবে তা জানতে চায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের সাড়ে পাঁচশ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি বর্তমানে থমকে থাকলেও নতুন করে চারশ কোটি ডলারের বেশি ঋণ নিয়ে আলোচনা চলছে, যা নিয়ে আগামী অক্টোবরে ওয়াশিংটনে আরও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে সরাসরি প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, নতুন বেতনকাঠামোর সঙ্গে আইএমএফের ঋণের কোনো সম্পর্ক নেই এবং কাজ চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়েও মন্তব্য করেন এবং জানান যে তিনি বিষয়টি নিয়ে একবারেই বিস্তারিত কথা বলবেন। অর্থ বিভাগের একটি সূত্র অনুযায়ী, আইএমএফ বাস্তবায়ন নিয়ে সরাসরি কোনো নির্দেশনা দেয়নি, শুধু অর্থের উৎস ও রাজস্ব আহরণ নিয়ে মতামত দিয়েছে।
প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে নবম জাতীয় বেতন কমিশন, যার নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান। কমিশন এ বছরের ২১ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয় এবং বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। এই সুপারিশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বর্তমানে যেখানে ব্যয় হয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা, নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে আরও ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।
বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নাসিমুল গনি কমিটি একাধিকবার সময়সীমা নিয়ে আলোচনা করেছে এবং শেষ পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে মূল বেতন এবং পরবর্তী অর্থবছরে ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্তে স্থির হয়েছে। ইতিমধ্যে গত ১১ জুন বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, আর জনপ্রশাসন খাতে সামগ্রিকভাবে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকায়, যার একটি বড় অংশ সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের জন্য নির্ধারিত।

