মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। সরবরাহে বিঘ্ন আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। গত জুলাইয়ের পর এই প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এই পর্যায়ে উঠল।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অন্যতম প্রধান মূল্যসূচক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। তবে পরবর্তী সময়ে দাম কিছুটা কমে আবার ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সর্বশেষ পাল্টাপাল্টি হামলার পর বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌযানে হামলার চেষ্টা করার পর মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের একাধিক তেলবাহী জাহাজ ‘ধ্বংস’ করার কথা জানিয়েছে। এর আগে ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের চারটি শহরে হামলা চালায়। ওই ঘটনায় ৭০ জনের বেশি আহত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি তেল স্থাপনায় আগুন ধরে যায়।
এসব ঘটনার প্রভাব দ্রুতই পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। আগস্টের শুরু থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসা এবং নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ঘিরে গত ছয় মাস ধরেই তেলের বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে ইতিহাসের অন্যতম বড় জ্বালানি সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কাও এর আগে সামনে এসেছিল।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম দফায় হামলা শুরু করার পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করেছিল। সে সময় বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করেছিলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে গেলে দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার মধ্যে এপ্রিলে অপরিশোধিত তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। পরে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা তৈরি হলে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে এবং দাম কমতে শুরু করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক ভেস্তে যাওয়ার পর আবার সংঘাত শুরু হলে তেলের দাম নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হয়।
শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক গ্যাসের বাজারেও। চলতি সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। কারণ তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার আবার বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও জোরালো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদদের একাংশ আশা করছেন, বছরের শেষ নাগাদ দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ অন্তত একবার সুদের হার বাড়াতে পারে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়লে সুদের হার নিয়ে ফেডের সিদ্ধান্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সুদের হার ও তেলের বাজারের মধ্যে পরোক্ষ সম্পর্কও রয়েছে। সুদের হার বাড়লে ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যায়। এতে বিনিয়োগ ও ভোগ কমার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে গেলে জ্বালানি তেলের চাহিদাও কমার আশঙ্কা তৈরি হয়, যা আবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়লে ডলার শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের লেনদেন প্রধানত ডলারে হওয়ায় শক্তিশালী ডলার আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য তেল কেনার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত এখন শুধু ওই অঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয়েই সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন, আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাসের দাম, মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হার—সবকিছুর ওপরই এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নতুন করে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলার অতিক্রম করা সেই অনিশ্চয়তাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

