দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তাঁর দাবি, দুদকে তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলোর সময়কাল ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা করলেই অভিযোগের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার ভিত্তি নেই বলে বোঝা যাবে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। সংবাদ সম্মেলনের শিরোনাম ছিল ‘অভিযোগ বনাম বাস্তবতা: এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে দুদকে দায়েরকৃত অভিযোগের প্রকৃত তথ্য ও ঘটনাপ্রবাহ’।
সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় মন্ত্রণালয়ের পদায়ন ও বদলিসংক্রান্ত বিষয়ে তাঁকে ঘিরে দুদকের সাম্প্রতিক অভিযোগ এবং সংস্থাটির মুখপাত্রের বক্তব্য ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার’।
নিজের বক্তব্যের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে একটি উপস্থাপনাও তুলে ধরেন তিনি। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষাপট, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়কাল এবং দুদকের মুখপাত্রের বক্তব্য নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
আসিফ মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে অর্থ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর দাবি, প্রকৃতপক্ষে ৩৮ জন নয়, ১১২ জনের চলতি দায়িত্ব বাতিল করা হয়েছিল এবং সেটি করা হয় প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায়ের ভিত্তিতে।
তিনি জানান, ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর ১১২ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয় তাঁদের চলতি দায়িত্ব বাতিল করে। আসিফ মাহমুদের দাবি, এটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং আদালতের রায় বাস্তবায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ ছিল।
আরেকটি অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এনসিপির এই নেতা। ওই অভিযোগে ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি ও পছন্দের স্থানে পদায়নের বিনিময়ে প্রায় দুই কোটি টাকা নেওয়ার প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। আসিফ মাহমুদ বলেন, অভিযোগটি করা হয় ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল এবং সংশ্লিষ্ট পদোন্নতির আদেশ হয় ১১ মে।
অথচ তিনি ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এরপর ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়। ফলে পরবর্তী মে মাসে হওয়া পদোন্নতির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার সুযোগ কীভাবে থাকতে পারে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘বিএনপি সরকার ক্ষমতায় বসে থাকা অবস্থায় পদোন্নতি করি, টাকা নিই—এটা কীভাবে সম্ভব?’
তাঁর প্রশ্ন, ওই পদোন্নতির ক্ষেত্রে সত্যিই কোনো দুর্নীতি হয়ে থাকলে সে সময় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে অনুসন্ধান না করে কেন তাঁকে অনুসন্ধানের আওতায় আনা হচ্ছে।
আসিফ মাহমুদের দাবি, দুদক অভিযোগ যাচাইয়ের সময় অভিযোগের তারিখ, সিদ্ধান্তের সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে কে দায়িত্বে ছিলেন—এসব তথ্য বিবেচনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার কথা। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বলে দাবি করেন।
একই সঙ্গে দুদককে রাজনৈতিকভাবে পরিচালনার অভিযোগও তুলেছেন এনসিপির মুখপাত্র। তাঁর ভাষ্য, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুদক কমিশন-সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুনভাবে কমিশন গঠন করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান দুদকের অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ভয় দেখানো ও হয়রানি করা।
দুদকের মুখপাত্রের একটি বক্তব্য নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন আসিফ মাহমুদ। তাঁর দাবি, দুদকের মুখপাত্র প্রথমে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার পর অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। পরে সাংবাদিকদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ওই বক্তব্য ভুলবশত বলা হয়েছিল জানিয়ে সেটি ব্যবহার না করার অনুরোধ করা হয়।
আসিফ মাহমুদের অভিযোগ, প্রথম বক্তব্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার খবর প্রকাশ হলেও পরবর্তী সময়ে তা প্রকাশ্যে প্রত্যাহার বা সংশোধন করা হয়নি। এতে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুরো ঘটনাকে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ এবং রাজনৈতিক হয়রানির অংশ হিসেবেও অভিহিত করেছেন আসিফ মাহমুদ। দুদকের মুখপাত্রের বক্তব্যের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন আসিফ মাহমুদ। শুরুতে শ্রম এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পান। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে উপদেষ্টার পদ ছাড়ার পর ওই মাসের শেষ দিকে তিনি এনসিপিতে যোগ দেন এবং বর্তমানে দলটির মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছেন।

