পুরান ঢাকার বাদামতলী ফলের আড়তে ট্রাক থেকে সরকারি পার্কিং ফি’র নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ফি যেখানে ট্রাকপ্রতি ১০০ টাকা, সেখানে ফলভর্তি ট্রাক থেকে নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার টাকা। খালি ট্রাকের জন্যও দিতে হচ্ছে ১ হাজার টাকা। অভিযোগ রয়েছে, টাকা না দিলে চালকদের মারধরের ভয় দেখানো হয়।
বাদামতলী ঘাটসংলগ্ন বাকল্যান্ড বাঁধের পার্কিং ইয়ার্ডে গত ৩ জুলাই এমনই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন বেনাপোল থেকে ফল নিয়ে আসা ট্রাকচালক মেহেদী হাসান। তাঁর কাছ থেকে পার্কিংয়ের কথা বলে ২ হাজার টাকা নেওয়া হলেও কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি।
আরেক ট্রাকচালক মাসুম বিল্লাহ জানান, ইজারাদারের লোক পরিচয় দিয়ে টাকা নেওয়া হয়। বাইরে থেকে আসা চালকেরা ঝামেলা এড়াতে দাবিকৃত টাকা দিতে বাধ্য হন।
সরকারি ফি ১০০, নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার
বিআইডব্লিউটিএর নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী, ওই এলাকায় ট্রাক, বাস ও কাভার্ড ভ্যান রাখার ফি ১০০ টাকা। মিনিবাস ও মিনিট্রাকের জন্য ৬০ টাকা, মাইক্রোবাসের জন্য ৫০ টাকা এবং প্রাইভেট কার ও জিপের জন্য ৩০ টাকা নির্ধারিত।
কিন্তু বাস্তবে ট্রাকের ক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে ১ থেকে ২ হাজার টাকা। কনটেইনারবাহী বড় লরি থেকে নেওয়া হচ্ছে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত।
পার্কিং ইয়ার্ডে একসঙ্গে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি ফলের ট্রাক রাখা যায়। বাদামতলী ঘাট থেকে বাবুবাজার সেতু পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকায় এক পাশে ফলের আড়ত এবং অন্য পাশে বুড়িগঙ্গা নদী।
২০১৯ সালে বিআইডব্লিউটিএ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীর পাড়ের জায়গা উদ্ধার করে। পরে সেখানে ওয়াকওয়ে, সীমানাপ্রাচীর ও পার্কিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়। প্রতিবছর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ঘাট ও পার্কিং ইয়ার্ড ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল।
তবে মামলা জটিলতার কারণে গত দুই অর্থবছরে নতুন করে ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পুরোনো ইজারার মেয়াদ মাসে মাসে বাড়ানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগকেই অতিরিক্ত টাকা আদায়ের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
‘ছয়জন টাকা তুলি’
গত ৩ জুলাই পার্কিং ইয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, একটি রিকশা মেরামতের দোকানে বসে টাকা গুনছিলেন সোহরাব হোসেন। তিনি নিজেকে ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচয় দেন।
সোহরাব জানান, তিনি জেটি পয়েন্টের দায়িত্বে রয়েছেন এবং ইজারাদারের হয়ে টাকা সংগ্রহ করেন। তাঁর দাবি, মোট ছয়জন সেখানে টাকা তোলেন। পরে সেই টাকা ওপর মহলে পাঠানো হয়।
সোহরাব ছাড়াও মো. মুন্না, কবীর হোসেন ও মো. শাহীনের নাম পাওয়া গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের সবাই যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, বাদামতলীতে প্রতিদিন দেড় শতাধিক ফলের ট্রাক আসে। প্রতি ট্রাকে ২ হাজার টাকা করে নিলে দৈনিক আদায় দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ টাকা। মাসে এই অঙ্ক প্রায় ৯০ লাখ টাকা। খালি ট্রাকের হিসাব ধরলে আদায়ের পরিমাণ মাসে কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
শুধু ট্রাক নয়, পার্কিং ইয়ার্ডের ছোট দোকানগুলোর কাছ থেকেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেখানে প্রায় ৭০টি চা ও খাবারের দোকান আছে। একটি দোকানের মালিক জানান, বেচাবিক্রি হোক বা না হোক, প্রতিদিন ৩০০ টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে দোকান সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
ইজারাদার আওয়ামী লীগ নেতা, নিয়ন্ত্রণে বিএনপির নেতারা
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পার্কিং ইয়ার্ডটি এক বছরের জন্য ৯৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকায় ইজারা নেন মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের মধ্যপাড়া ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আবদুল করিম, যিনি করিম হাজি নামে পরিচিত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরপর স্থানীয় শ্রমিক দল ও যুবদলের কয়েকজন নেতা পার্কিং ইয়ার্ডের নিয়ন্ত্রণ নেন বলে অভিযোগ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য নতুন ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সময় করিম হাজির পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। সেই মামলার কারণে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হয়নি। ফলে পুরোনো ইজারার মেয়াদ মাসে মাসে বাড়ানো হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মো. মোবারক হোসেন মজুমদার জানিয়েছেন, নির্ধারিত ফি’র বেশি টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। কেউ অতিরিক্ত টাকা নিলে লিখিত অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অতিরিক্ত আদায় করা টাকার একটি অংশ বিআইডব্লিউটিএর অসাধু কর্মকর্তাদের কাছেও যায়। যদিও এই অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
তিন বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
স্থানীয় ফল ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে পার্কিং ইয়ার্ড নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে তিনজন শ্রমিক দল ও যুবদল নেতার নাম এসেছে।
তাঁরা হলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক দলের আহ্বায়ক সুমন ভূঁইয়া, কোতোয়ালি থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহমেদ হোসেন সোবহান এবং সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জুয়েল হাওলাদার।
সুমন ভূঁইয়ার দাবি, করিম হাজি পালিয়ে যাওয়ার পর তিনি তাঁদের কাছে পার্কিংয়ের দায়িত্ব দিয়ে গেছেন এবং বিআইডব্লিউটিএকে বিষয়টি জানিয়েছেন। এরপর থেকে তাঁরা ইজারার মাসিক অর্থ পরিশোধ করে পার্কিং পরিচালনা করছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তবে করিম হাজি সত্যিই তাঁদের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁর মুঠোফোনও বন্ধ রয়েছে।
চাঁদার প্রভাব পড়ছে ফলের দামে
বাদামতলী দেশের অন্যতম বড় পাইকারি ফলের বাজার। আমদানি করা ও দেশীয় ফল এখান থেকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যেমন যায়, তেমনি দেশের অন্যান্য স্থানেও সরবরাহ করা হয়।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুধু পার্কিং ইয়ার্ডেই নয়, বাদামতলীতে ট্রাক প্রবেশের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন নামে টাকা দিতে হয়। আর পরিবহন ও পার্কিংয়ের এই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত যোগ হচ্ছে ফলের দামের সঙ্গে।
ঢাকা মহানগর ফল আমদানি-রপ্তানিকারক ও আড়তদার ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যবসার সব খরচই শেষ পর্যন্ত ফলের দামের মধ্যে যুক্ত হয়। পার্কিংয়ের জন্য বেশি টাকা দিতে হলে সেটিও ফলের দাম নির্ধারণের সময় হিসাব করতে হয়।
ফলে সরকারি ফি যেখানে মাত্র ১০০ টাকা, সেখানে ট্রাকপ্রতি অতিরিক্ত হাজার হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ শুধু চালকদের ওপর চাপ তৈরি করছে না; এর প্রভাব পড়ছে পুরো ফলের সরবরাহব্যবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতার পকেটেও।



