অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের বার্তা পরিষ্কার—ফলাফল নিয়ে আগাম হিসাব নয়, পাঁচ দিন ভালো ক্রিকেট খেলাই দলের মূল লক্ষ্য। দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নামার আগে নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিতে প্রস্তুত বাংলাদেশ।
আগামীকাল সকাল সাড়ে ছয়টায় ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে শুরু হবে দুই ম্যাচের সিরিজের প্রথম টেস্ট। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে বাংলাদেশের জন্য এটি বড় পরীক্ষা। কারণ, ২০০৩ সালের পর এই প্রথম অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশকে নিয়ে অবশ্য কিছুটা সংশয় রয়েছে। তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ। এর পর প্রশ্ন উঠেছে, অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী টেস্ট দলের বিপক্ষে পাঁচ দিন লড়াই করার মতো সামর্থ্য বাংলাদেশ দেখাতে পারবে কি না।
তবে এসব হিসাব নিয়ে খুব বেশি ভাবতে চান না নাজমুল। ডারউইনে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, খেলোয়াড় হিসেবে তাঁদের লক্ষ্য থাকবে প্রতিটি সেশন ভালোভাবে খেলা এবং যতটা সম্ভব ভালো ক্রিকেট উপহার দেওয়া।
নাজমুলের মতে, ম্যাচটি তিন দিন, চার দিন নাকি পাঁচ দিন চলবে—এ ধরনের আলোচনা বাইরে থাকতেই পারে। কিন্তু দলের ভেতরে মূল মনোযোগ থাকবে প্রতিটি সেশনে নিজেদের সেরা ক্রিকেট খেলার দিকে।
বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, ‘আমরা তো খেলোয়াড় হিসেবে পাঁচ দিন ভালো ক্রিকেট খেলতে চাই, প্রতিটা সেশন বাই সেশন খেলতে চাই।’
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ব্যক্তিগত ও দলীয় পারফরম্যান্সকে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছেন নাজমুল। তাঁর মতে, একজন ব্যাটারের বড় স্কোর কিংবা একজন বোলারের পাঁচ উইকেট শুধু ওই ম্যাচের জন্য নয়, দলের ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নাজমুল বলেন, কাউকে আলাদা করে বাড়তি অনুপ্রেরণা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সবাই জানেন, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভালো একটি ইনিংস, পাঁচ উইকেট কিংবা দল হিসেবে ভালো পারফরম্যান্স নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। তাই দলের সবাই ভালো করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী।
অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। মারারা স্টেডিয়ামের উইকেটটি ড্রপ-ইন পিচ। এ ধরনের উইকেটে সাধারণত পেসাররা বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন। বিশেষ করে নতুন বলে অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণ বাংলাদেশের ব্যাটারদের কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যাটারদের জন্য নাজমুলের পরামর্শও পরিষ্কার। নতুন বল সামলানোর পাশাপাশি দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রেখে ব্যাটিং করতে হবে।
নাজমুল বলেন, নতুন বলে সব জায়গাতেই চ্যালেঞ্জ থাকে, তবে এই কন্ডিশনে সেটি আরও বেশি হতে পারে। তাই যে ব্যাটারই ক্রিজে যাবেন, তাঁকে নিজের সহজাত খেলাটা খেলতে হবে এবং রান করার মানসিকতা নিয়েই ব্যাটিং করতে হবে।
বাংলাদেশ অধিনায়ক আরও বলেন, অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণ সামলাতে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু টিকে থাকার জন্য নয়, ভালো চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা নিয়ে রান করার জন্য ব্যাটিং করতে হবে।
এর মধ্যে বাংলাদেশ শিবিরে স্বস্তির খবর দিয়েছেন লিটন দাস। চোটের কারণে প্রস্তুতি ম্যাচে না খেললেও এখন তিনি পুরোপুরি ফিট। এক অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে নাজমুল নিশ্চিত করেছেন, লিটন শতভাগ ফিট রয়েছেন।
লিটনের ফিট হয়ে ওঠাকে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে অভিজ্ঞ এই ব্যাটারের উপস্থিতি বাংলাদেশকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিতে পারে।
তবে প্রতিপক্ষ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার শক্তি নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি নেই বাংলাদেশের। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তিন চক্রের দুটিতেই ফাইনাল খেলেছে অস্ট্রেলিয়া। ঘরের মাঠে তাদের বিপক্ষে বাংলাদেশের কাজ তাই সহজ হবে না।
২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সর্বশেষ টেস্ট সিরিজ খেলেছিল বাংলাদেশ। সেই সিরিজের দুই ম্যাচেই বাংলাদেশ ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল। এরপর দুই দলের ক্রিকেটে অনেক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটও আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে টেস্টে বাংলাদেশের কিছু ভালো পারফরম্যান্স থাকলেও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ব্যবধান যে এখনো বড়, সেটিও বাস্তবতা। তাই এই সিরিজে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হতে পারে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করা।
নাজমুলের কথাতেও সেই আত্মবিশ্বাসই ফুটে উঠেছে। তিনি ফলাফল নিয়ে আগে থেকেই কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করতে চান না। বরং প্রতিটি সেশন ধরে ম্যাচ এগিয়ে নেওয়াই তাঁর পরিকল্পনা।
আগামীকাল প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের সামনে থাকবে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী পেস আক্রমণ, কঠিন কন্ডিশন এবং ঘরের মাঠের অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে বাংলাদেশের সামনে থাকবে নিজেদের ব্যাটিং সামর্থ্য দেখানোর এবং বোলিং আক্রমণ দিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে ফেলার সুযোগ।
লিটন দাসের ফিট হয়ে ওঠা বাংলাদেশকে স্বস্তি দিয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নাজমুলের ‘পাঁচ দিন ভালো ক্রিকেট’ খেলার পরিকল্পনা মাঠে কতটা বাস্তবায়ন করতে পারে বাংলাদেশ?
উত্তর মিলবে মারারা স্টেডিয়ামে। তবে সিরিজ শুরুর আগে অধিনায়কের বার্তা স্পষ্ট—প্রতিপক্ষ যত শক্তিশালীই হোক, বাংলাদেশ সেশন ধরে লড়াই করতে চায় এবং সুযোগ পেলেই রান করতে চায়।



