প্রেমের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে, আগের মতো ভালোবাসাও আর নেই। তারপরও সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে কথা হচ্ছে, মাঝেমধ্যে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে, এমনকি বন্ধুত্বও রয়ে গেছে। সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরও কেন অনেকে সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেন না—এ নিয়ে মনোবিষয়ক সাময়িকী সাইকোলজি টুডের একটি প্রতিবেদনে চারটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাসহ কয়েকটি গবেষণার ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচ্ছেদের পর সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখার কারণ সবার ক্ষেত্রে এক নয়। কেউ মানসিক স্বস্তি ও পুরোনো ভরসার জায়গা থেকে যোগাযোগ রাখেন, কেউ বাস্তব প্রয়োজনের কারণে, আবার কারও মনে পুরোনো ভালোবাসা এখনো থেকে যায়।
সম্পর্কে থাকার সময় দুজন মানুষের মধ্যে সাধারণত একধরনের বিশ্বাস ও নির্ভরতা তৈরি হয়। দিনের নানা ঘটনা ভাগ করে নেওয়া, মন খারাপের সময় কথা বলা কিংবা বিপদে একে অপরকে পাশে পাওয়ার অভ্যাস তৈরি হতে পারে। সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও দীর্ঘদিনের সেই অভ্যাস একদিনে শেষ হয় না।
এ কারণেই অনেকে বিচ্ছেদের পর সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পরিচিত একজন মানুষের কাছে মনের কথা বলা বা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা মানসিক স্বস্তি দিতে পারে। তবে এ ধরনের বন্ধুত্ব তখনই স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে, যখন দুজনই সম্পর্কের পরিবর্তিত অবস্থাকে মেনে নেন এবং পরস্পরের সীমারেখাকে সম্মান করেন।
আবার সব ক্ষেত্রে আবেগ বা ভালোবাসাই যোগাযোগের কারণ নয়। অনেক সময় বাস্তব প্রয়োজনেও সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। দুজনের একই বন্ধুমহল থাকতে পারে, যৌথ কোনো সম্পদের বিষয় থাকতে পারে কিংবা পোষা প্রাণীর দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে হতে পারে। সন্তান থাকলে তার দায়িত্বের কারণেও নিয়মিত যোগাযোগের প্রয়োজন হতে পারে।
কখনো আর্থিক বা অন্য কোনো বাস্তব সুবিধার কারণেও সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ থেকে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু প্রয়োজনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এ ধরনের বন্ধুত্ব সব সময় দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তবে প্রেমের সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরও প্রয়োজনীয় বিষয়ে দুজনের মধ্যে স্বাভাবিক ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় থাকতে পারে।
তৃতীয় একটি কারণ হলো ঝামেলা এড়িয়ে চলার চেষ্টা। বিচ্ছেদের পর নতুন করে তর্ক, মনোমালিন্য বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে জড়াতে চান না অনেকেই। ফলে তাঁরা সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলেন, প্রয়োজন হলে খোঁজখবর নেন এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ বজায় রাখেন।
কেউ কেউ মনে করেন, হঠাৎ করে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে সাবেক সঙ্গী কষ্ট পেতে পারেন। আবার একই বন্ধুমহলে চলাফেরা করলে পুরোপুরি যোগাযোগ বন্ধ রাখা কঠিনও হতে পারে। ফলে সামাজিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্যও বন্ধুত্ব থেকে যায়। তবে শুধু দ্বন্দ্ব এড়ানোর উদ্দেশ্যে যে বন্ধুত্ব বজায় রাখা হয়, সেটি অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
চতুর্থ কারণটি আরও আবেগনির্ভর—সম্পর্ক শেষ হলেও ভালোবাসা পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিচ্ছেদের পরও কেউ কেউ সাবেক সঙ্গীকে ফিরে পাওয়ার আশা করেন। তাই বন্ধুত্বের সম্পর্ক বজায় রেখে যোগাযোগ চালিয়ে যান। তাঁদের মনে থাকতে পারে, ভবিষ্যতে হয়তো আবার পুরোনো সম্পর্ক ফিরে আসবে।
কেউ আবার সাবেক সঙ্গীকে অন্য কারও সঙ্গে দেখতে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন না। ফলে প্রেমের সম্পর্ক শেষ হলেও যোগাযোগ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারেন না। তবে এই পরিস্থিতিতে সমস্যা তৈরি হতে পারে, যদি একজন সত্যিকার অর্থে শুধু বন্ধুত্ব চান, কিন্তু অন্যজন সেই বন্ধুত্বের মধ্যেই আবার প্রেমে ফেরার সম্ভাবনা খুঁজতে থাকেন।
তাহলে সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা কি খারাপ? বিষয়টি এত সরল নয়। সাবেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকলেই যে পুরোনো প্রেম ফিরে আসবে, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রেমের অনুভূতি শেষ হওয়ার পরও দুজনের মধ্যে স্বাভাবিক বন্ধুত্ব থাকতে পারে। আবার কোনো তিক্ততা ছাড়াই সম্পর্ক শেষ হলে পরবর্তী সময়েও যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব।
সাইকোলজি টুডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের অন্তত একজন সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব রয়েছে। প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের আবার একাধিক সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে বন্ধুত্ব রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিষমকামীদের তুলনায় এলজিবিটিকিউ ব্যক্তিদের মধ্যে বিচ্ছেদের পর সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
তবে সাবেকের সঙ্গে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুজনের প্রত্যাশা ও সীমারেখা পরিষ্কার থাকা। একজন যদি সম্পর্কটি পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে চান, অথচ অন্যজন বন্ধুত্বের আড়ালে আবার প্রেমে ফেরার আশা ধরে রাখেন, তাহলে সেই যোগাযোগ মানসিক স্বস্তির বদলে নতুন করে কষ্টের কারণ হয়ে উঠতে পারে।


