নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে পরিচালিত এন্টারপ্রাইজ-বেজড ট্রেনিং বা ইবিটি কার্যক্রমে প্রশিক্ষণ নিয়ে ১৩ হাজার ৮৯৫ নারী চাকরি, আত্মকর্মসংস্থান কিংবা বিভিন্ন আয়মূলক কাজে যুক্ত হয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর বাস্তবায়িত অ্যাসেট প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি বা বিডব্লিউসিসিআই এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
অ্যাসেট-বিডব্লিউসিসিআইয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৯২৭টি ব্যাচে মোট ৪৬ হাজার ২৪৮ নারী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রতি ব্যাচে ২৪ জন করে প্রশিক্ষণার্থী নেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা শতভাগ পূরণ হয়েছে।
প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত ৩৮ হাজার ৪৮ নারী দক্ষতা যাচাইয়ে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬ হাজার ৫৭৪ জনকে দক্ষ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। আর প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থান বা আত্মকর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে ১৩ হাজার ৮৯৫ নারীর। তাঁদের মধ্যে আটজন প্রতিবন্ধী নারী এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৭৩ জন নারী রয়েছেন।
তবে ১৩ হাজার ৮৯৫ জনের এই সংখ্যাকেই চূড়ান্ত ফল হিসেবে দেখছে না বিডব্লিউসিসিআই। কারণ, প্রশিক্ষণ নেওয়া নারীদের একটি অংশ এখনো দক্ষতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। আবার অনেকের প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কর্মসংস্থানের তথ্য সংগ্রহ ও অনুসরণের কাজও চলমান। এসব কার্যক্রম শেষ হলে কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানে যুক্ত নারীর সংখ্যা আরও হালনাগাদ হতে পারে।
প্রকল্পটিতে কর্মসংস্থান বলতে শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়াকে বোঝানো হচ্ছে না। প্রশিক্ষণ শেষে কেউ নিজের উদ্যোগে আয়মূলক কাজে যুক্ত হলে, ছোট ব্যবসা শুরু করলে, বাড়িতে বসে ব্যবসা পরিচালনা করলে কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে কোনো পণ্য বা সেবা দিয়ে আয় করলে সেটিও আত্মকর্মসংস্থানের আওতায় ধরা হচ্ছে।
অর্থাৎ প্রশিক্ষণ নিয়ে একজন নারী যেমন কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে পারেন, তেমনি নিজের ব্যবসাও শুরু করতে পারেন। স্থানীয় বাজারে পণ্য বা সেবা দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসার পরিধি বাড়িয়ে অন্য মানুষের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন। এ কারণেই প্রশিক্ষণে শুধু কারিগরি দক্ষতা অর্জন নয়, অর্জিত দক্ষতা ব্যবহার করে আয় এবং উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই কার্যক্রমে ‘ইন্ডাস্ট্রি পার্টনার’ হিসেবে কাজ করছে বিডব্লিউসিসিআই। বিভিন্ন জেলার শিল্পকারখানা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থীদের সংযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ শেষে চাকরির সুযোগ খোঁজার পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ব্যবসা ও অর্থায়নসংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শুধু শ্রেণিকক্ষে প্রশিক্ষণ নয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব কর্মপরিবেশে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও পাচ্ছেন প্রশিক্ষণার্থীরা। এর ফলে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পাওয়া দক্ষতা বাস্তবে কীভাবে কাজে লাগাতে হবে, সে সম্পর্কেও ধারণা তৈরি হচ্ছে তাঁদের।
নারীদের জন্য প্রশিক্ষণের বিষয়েও রাখা হয়েছে বৈচিত্র্য। টেইলারিং অ্যান্ড ড্রেস মেকিং, ফ্যাশন ডিজাইন, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ও মডেলিং, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ প্রোডাকশন, এমব্রয়ডারি, হ্যান্ড স্টিচিং, ব্লক-বাটিক ও স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের মতো বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া বিউটিফিকেশন, কেয়ারগিভিং, আইসিটি ও ফ্রিল্যান্সিং এবং এন্টারপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্টের মতো বিষয়ও রয়েছে প্রশিক্ষণ তালিকায়। এসব দক্ষতার অনেকগুলো ব্যবহার করে তুলনামূলক কম বিনিয়োগে ছোট পরিসরে কাজ বা ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। পরবর্তী সময়ে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে পারলে অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অ্যাসেট-বিডব্লিউসিসিআই কার্যক্রমের আওতায় এখন পর্যন্ত প্রশিক্ষণ নেওয়া ৪৬ হাজার ২৪৮ জনের সবাই নারী। পরবর্তী পর্যায়ে দক্ষ নারীদের জন্য চাকরি ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের বাজার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কর্মসংস্থানের তথ্য যাচাই ও নিয়মিত অনুসরণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে কী ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হচ্ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিডব্লিউসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট সঙ্গীতা আহমেদ বলেন, নারীদের দক্ষতা ও উদ্যোক্তা হিসেবে সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের জন্য বাজারসংযোগ, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, গ্রাম ও শহরের নারী উদ্যোক্তারা অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখতে পারেন।
অ্যাসেট-বিডব্লিউসিসিআই প্রকল্পের ডেপুটি সাব-প্রজেক্ট ম্যানেজার সুমন্ত কুমার মহন্ত বলেন, এন্টারপ্রাইজ-বেজড ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে ৪৬ হাজারের বেশি নারীকে দক্ষতা প্রশিক্ষণের আওতায় আনা গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে তাঁদের লক্ষ্য শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশিক্ষণ শেষে নারীরা যেন অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে চাকরি পান, আত্মকর্মসংস্থানে যুক্ত হন কিংবা নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন, সেদিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।


