দেশে নতুন করে আরও চারটি ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন অনুমোদনের পাশাপাশি আগে অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় থাকা নগদ ডিজিটাল ব্যাংক ও কড়ি ডিজিটাল ব্যাংকও নতুন শর্ত পূরণ করতে পারলে কার্যক্রমে আসার সুযোগ পেতে পারে।
নতুন করে অনুমোদনের জন্য নির্বাচিত চারটি প্রতিষ্ঠান হলো বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান-ডিকে, নোভা ডিজিটাল ব্যাংক এবং বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ প্রতিষ্ঠানগুলোকে লেটার অব ইনটেন্ট বা এলওআই দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এলওআই চূড়ান্ত ব্যাংকিং লাইসেন্স নয়; নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে পরবর্তী ধাপে এগোনোর প্রাথমিক সম্মতি।
বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা হিসেবে রয়েছে মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা বিকাশ। ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান-ডিকের পেছনে রয়েছে ভুটানের ডিকে ব্যাংক। নোভা ডিজিটাল ব্যাংক বাংলালিংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ এবং বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক রবি আজিয়াটার উদ্যোগ।
বৃহস্পতিবারের সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। এর মধ্য দিয়ে কয়েক বছর ধরে আলোচনায় থাকা দেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং কার্যক্রম নতুন একটি ধাপে প্রবেশ করল।
ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে মূলধনের শর্তও আগের তুলনায় কঠোর করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, একটি ডিজিটাল ব্যাংককে কার্যক্রম শুরুর জন্য ন্যূনতম ৩০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন রাখতে হবে। এই মূলধন সাধারণ শেয়ারের মাধ্যমে পরিশোধিত হতে হবে।
ডিজিটাল ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকের মতো শাখা-উপশাখানির্ভর হবে না। প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে হিসাব খোলা, টাকা জমা ও স্থানান্তর, পেমেন্ট এবং ঋণের আবেদনের মতো বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় শাখাবিহীন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা বা সীমিত সেবা পাওয়া জনগোষ্ঠীর কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন চার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নগদ ডিজিটাল ব্যাংক ও কড়ি ডিজিটাল ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগের সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠান দুটি ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন প্রক্রিয়ায় আসে। ২০২৩ সালে নগদ ও কড়িকে এলওআই দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নগদের লাইসেন্স পর্যালোচনায় যায় এবং কড়িকে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের জন্য বাড়তি সময় দেওয়া হয়।
সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নগদ ডিজিটাল ব্যাংকের মালিকানায় যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত পাঁচটি কোম্পানি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে নিবন্ধন, মালিকানা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, কর-পরবর্তী মুনাফা ও সম্পদের তথ্য জানতে ২০২৪ সালের আগস্টে সংশ্লিষ্ট দেশে তথ্য চেয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে চাওয়া তথ্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কড়ি ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রেও বিদেশে নিবন্ধিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য না পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন নগদ ও কড়ি নতুন শর্তে সম্মত হলে আবারও লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়ায় এগোতে পারবে। তবে বিতর্কিত বা পলাতক উদ্যোক্তাদের না রাখা এবং নতুন পরিশোধিত মূলধনের শর্ত পূরণের বিষয়টি প্রযোজ্য হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
দেশে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুরু হয় ২০২৩ সালে। প্রথম দফায় বিপুলসংখ্যক আবেদন থেকে নগদ ও কড়িকে প্রাথমিক সম্মতি দেওয়া হয়েছিল। পরে ডিজিটাল ব্যাংকের নীতিমালায় পরিবর্তন আসে এবং দ্বিতীয় দফায় নতুন আবেদন নেওয়া হয়। সাম্প্রতিক আবেদনকারীদের মধ্যে মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন চারটি প্রতিষ্ঠান এখন নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর পরবর্তী প্রস্তুতি নিতে পারবে। তবে প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া মানেই এখনই ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করা নয়। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, মূলধন ও নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণের পরই তারা পরবর্তী ধাপে যেতে পারবে।
নতুন চার ব্যাংকের অনুমোদনের পাশাপাশি নগদ ও কড়ির জন্যও শর্তসাপেক্ষে সুযোগ খোলা থাকায় দেশে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া আবারও গতি পেল। এখন মূল নজর থাকবে প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের মূলধন, প্রযুক্তি, সুশাসন ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত কতটা পূরণ করতে পারে তার ওপর।



