যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল আবার হামলা চালালে চলমান সংঘাতের ভৌগোলিক পরিসর ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইরান। বৃহস্পতিবার দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি এই হুঁশিয়ারি দেন।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্সে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় সাফাভি বলেন, সংঘাত ইতিমধ্যে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে এর জবাবে সংঘাতের ফ্রন্ট আরও বিস্তৃত হয়ে ভারত মহাসাগর এমনকি এর বাইরের এলাকাতেও পৌঁছাতে পারে।
সাফাভির এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতেও পড়ছে। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিও বর্তমান উত্তেজনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
ইয়েমেনের হুতিরা সম্প্রতি লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছে। এর ফলে কৌশলগত বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে তাদের অবস্থানও শক্তিশালী হয়েছে। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অন্যদিকে সুয়েজ খালের মাধ্যমে এই নৌপথ এশিয়া ও ইউরোপের বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হুতিদের সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে। তবে ইয়েমেনের সংঘাতে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে তেহরান। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইয়েমেন ও লোহিত সাগরের সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তার প্রভাব ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের কর্মকর্তারা এর আগেও সতর্ক করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আবার শুরু হলে সংঘাতের ভৌগোলিক পরিসর আরও বড় করা হতে পারে। তবে বৃহস্পতিবারের বক্তব্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সর্বোচ্চ নেতার কোনো উপদেষ্টা এবার সরাসরি ভারত মহাসাগরের কথা উল্লেখ করেছেন।
ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপস্থিতিও রয়েছে। দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে দুই দেশের একটি কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ইরান থেকে দ্বীপটির দূরত্ব প্রায় চার হাজার কিলোমিটার। ফলে সাফাভির বক্তব্যে ভারত মহাসাগরের নাম আসায় সংঘাতের সম্ভাব্য বিস্তৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্য ছিল সম্ভাব্য নতুন হামলার ক্ষেত্রে ইরানের প্রতিক্রিয়া নিয়ে সতর্কবার্তা; ভারত মহাসাগরে নির্দিষ্ট কোনো হামলার পরিকল্পনা তিনি ঘোষণা করেননি।
একদিকে সামরিক হুঁশিয়ারি চললেও অন্যদিকে সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। চলতি সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। যুদ্ধ বন্ধের জন্য নিজেদের কয়েকটি শর্তও সামনে এনেছে তেহরান।
ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশটির অর্থনীতির ওপর থাকা আর্থিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ নিঃশর্তভাবে ছাড় করার বিষয়টি। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শর্ত তুলে ধরেছে তেহরান।
এর আগে মঙ্গলবার ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবিও ইয়েমেনের যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি সামনে এনেছিলেন। অর্থাৎ একদিকে সংঘাতের পরিসর আরও বিস্তৃত করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনাও চলছে।
সাফাভির সর্বশেষ বক্তব্য তাই সরাসরি যুদ্ধ সম্প্রসারণের ঘোষণা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নতুন হামলা হলে ইরান কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, সে বিষয়ে একটি সতর্কবার্তা। তবে ভারত মহাসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের নাম সরাসরি উল্লেখ করায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও বড় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।



