নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধ, গাজা যুদ্ধ নিয়ে সমালোচনা এবং নিজ দেশে নির্বাচন সামনে রেখে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিতে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা। ধারণা করা হচ্ছে, জাতিসংঘের মঞ্চ থেকেই মামদানির বক্তব্যের কড়া জবাব দিতে পারেন তিনি।
নেতানিয়াহু ও মামদানির বিরোধ নতুন নয়। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করে আসছেন মামদানি। নেতানিয়াহুকে তিনি ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলেছেন এবং নির্বাচনী প্রচারের সময় জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পরিপ্রেক্ষিতে নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করবেন। পরে অবশ্য মামদানি স্বীকার করেন, এমন গ্রেপ্তার কার্যকর করার আইনি ক্ষমতা নিউইয়র্কের মেয়রের নেই।
নিউইয়র্ক সফরের আগে নেতানিয়াহুও সরাসরি মামদানিকে উদ্দেশ করে একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, ইসরায়েলি সেনাদের বিষয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে এবং মামদানির বক্তব্যের জবাব দিতে নিউইয়র্কে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে মামদানির বিরুদ্ধে হামাসকে সমর্থনের অভিযোগ করেন নেতানিয়াহু। তবে রয়টার্স ওই অভিযোগকে অসত্য বলে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
মামদানি নিউইয়র্কের মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর এবারই প্রথম শহরটিতে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু। আর তাঁর সফর ঘিরে বিক্ষোভের পরিকল্পনাও রয়েছে। ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের বিরোধী ইসরায়েলিদের পাশাপাশি ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদেরও কর্মসূচি রয়েছে। ফলে নেতানিয়াহুর সফর ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে এবারের জাতিসংঘ ভাষণের গুরুত্ব শুধু নিউইয়র্কের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েলেও কয়েক সপ্তাহ পর সাধারণ নির্বাচন। ফলে জাতিসংঘের মঞ্চে নেতানিয়াহুর বক্তব্য তাঁর দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও নির্বাচনের ফল কী হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেন মনে করছেন, নেতানিয়াহুর এবারের জাতিসংঘ ভাষণ অনেকটা নির্বাচনী প্রচারের বক্তব্যের মতো হতে পারে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ইসরায়েলের ভোটারদের কাছেও নিজের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু। তবে এটি ওরেনের বিশ্লেষণ, নেতানিয়াহুর ঘোষিত নির্বাচনী কৌশল নয়।
এবার নিউইয়র্কে খুব অল্প সময় থাকবেন নেতানিয়াহু। দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, তাঁর পুরো নিউইয়র্ক সফর আট ঘণ্টারও কম হতে পারে। বৃহস্পতিবার পৌঁছে জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার পর একই দিন ইসরায়েলে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। গত বছরের দীর্ঘ সফরের তুলনায় এবারের সফর তাই অনেকটাই ব্যতিক্রম।
নেতানিয়াহুকে বহনকারী সরকারি উড়োজাহাজ কোথায় অবতরণ করবে, সেটিও আলোচনায় এসেছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিবর্তে নিউজার্সির কোনো সামরিক বিমানঘাঁটি বা বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। এর পেছনে মামদানির সঙ্গে সম্ভাব্য বিরোধ এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে।
এবারের সফরের আরেকটি আলোচিত বিষয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর বৈঠক না হওয়া। গত বছর জাতিসংঘ অধিবেশনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক সপ্তাহ ছিলেন নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্পের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হয়েছিল। এবার সফর কয়েক ঘণ্টার হলেও তাঁর কার্যালয়ের ঘোষিত বৈঠকের তালিকায় কোনো মার্কিন কর্মকর্তার নাম নেই।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সম্পর্কেও কিছু মতপার্থক্য সামনে এসেছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে দুই দেশের কৌশল ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভিন্ন অবস্থানের আলোচনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সফরে এসে ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর বৈঠক না হওয়াকে কিছু বিশ্লেষক রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। তবে বৈঠক না হওয়া দুই নেতার মধ্যে দূরত্বের প্রমাণ—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দুই পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘের মঞ্চে নেতানিয়াহুর এবারের উপস্থিতি একাধিক কারণে নজরে থাকবে। একদিকে গাজা যুদ্ধ ও ইরান নিয়ে তাঁর সরকারের অবস্থান, অন্যদিকে নিউইয়র্কের মেয়র মামদানির সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন এবং ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক না হওয়ার বিষয়টি।
ফলে জাতিসংঘের ভাষণে নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির পাশাপাশি মামদানির বক্তব্যের কতটা জবাব দেন এবং নিজ দেশের ভোটারদের উদ্দেশে কী বার্তা দেন, এখন নজর থাকবে সেদিকেই।


