শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩, ১৩ রবিউস সানি ১৪৪৮

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখন শুধু বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার সমস্যা নয়, বরং এটি ক্রমেই একটি কঠিন নীতিগত ও কাঠামোগত সংকটে রূপ নিচ্ছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান। তাঁর মতে, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা কিংবা আমদানি ব্যয়কে এককভাবে দায়ী করলে দেশের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। বাজারব্যবস্থা, রাজস্বনীতি, জ্বালানি খাত ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির দুর্বলতাও এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বৃহস্পতিবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন।

তিনি উল্লেখ করেন, দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ সাম্প্রতিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও তুলনামূলক দ্রুত মূল্যস্ফীতি কমাতে পেরেছে। কিন্তু বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৯ শতাংশ হতে পারে।

সেলিম রায়হানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খাদ্যপণ্যের দাম, টাকার অবমূল্যায়ন এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ব্যয় মূল্যস্ফীতির গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তবে এর পাশাপাশি বাজারে দুর্বল প্রতিযোগিতা, সরবরাহব্যবস্থার বাধা, পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বাজারে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবনও মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।

তাঁর মতে, উৎপাদন বা সরবরাহ ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই ব্যয় কমলেও একই গতিতে পণ্যের দাম কমছে না। বাজার তদারকির দুর্বলতা এবং কার্যকর প্রতিযোগিতা নীতির অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও সেলিম রায়হান মনে করেন, শুধু সুদের হার বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ, সুদের হার দিয়ে পণ্যবাজারের প্রতিযোগিতার ঘাটতি কিংবা সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার মতো সমস্যার সরাসরি সমাধান করা যায় না।

এর সঙ্গে নতুন চাপ তৈরি করছে সরকারের রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা। সামাজিক সুরক্ষা, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের ব্যয়ের অঙ্গীকার বাড়ছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণের কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো কাটেনি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা দেশীয় উৎস থেকে অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

সেলিম রায়হানের মতে, টেকসই রাজস্ব বৃদ্ধির তুলনায় সরকারি ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকলে ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ তারল্যের ওপর চাপ এবং অর্থায়নের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ঘাটতি অর্থায়ন অতিরিক্ত বেড়ে গেলে সেটিও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

এই অর্থনীতিবিদের মতে, নতুন ব্যয়ের অঙ্গীকারের সঙ্গে টেকসই রাজস্বের উৎস যুক্ত করে একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনারও ঘাটতি রয়েছে।

এর মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিন—চার ধরনের জ্বালানির দামই বেড়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ, পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে সেচ, গণপরিবহন, জেনারেটর ও শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে ডিজেলের ব্যবহার সরাসরি যুক্ত।

ফলে জ্বালানির ব্যয় বাড়লে খাদ্যপণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। তবে সেলিম রায়হানের মতে, বিষয়টিকে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। দেশের জ্বালানি খাতের অদক্ষতা, মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি, পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর করের বোঝা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুর্বলতাও আলোচনায় আনা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না করে বাড়তি ব্যয় বারবার ভোক্তার ওপর চাপানো হলে প্রতিটি মূল্যসমন্বয় মূল্যস্ফীতির নতুন উৎস হয়ে উঠতে পারে।

মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বল অবস্থাকেও উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখছেন সেলিম রায়হান। ব্যবসায়ীরা নীতিগত অনিশ্চয়তা, নিয়ন্ত্রক জটিলতা, জ্বালানি ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কথা বলে আসছেন। তাঁর বিশ্লেষণে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ, আমলাতান্ত্রিক বাধা ও নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে সংশয়ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে পিছিয়ে দিতে পারে।

বিনিয়োগ কম থাকলে ভবিষ্যতে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার গতিও কমে যায়। একদিকে সরবরাহ সক্ষমতা ধীরে বাড়বে, অন্যদিকে চাহিদা বাড়তে থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে কম বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বৃদ্ধির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সেলিম রায়হানের বিশ্লেষণে বর্তমান পরিস্থিতিতে চারটি চাপ বিশেষভাবে সামনে এসেছে—দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, বাড়তে থাকা রাজস্বচাপ, জ্বালানি ব্যয়ের নতুন ধাক্কা এবং দুর্বল বিনিয়োগ।

তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলে হবে না। মুদ্রানীতিতে শৃঙ্খলার পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থায় বিশ্বাসযোগ্যতা, কার্যকর প্রতিযোগিতা নীতি, জ্বালানি খাতের সংস্কার, উন্নত সরবরাহব্যবস্থা এবং বিনিয়োগের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ প্রয়োজন।

এসব ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার না হলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাময়িক সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন সেলিম রায়হান। আর এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়তে পারে স্থির আয় কিংবা যাঁদের আয় ধীরে বাড়ছে, এমন মানুষের ওপর।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version