শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩, ১৩ রবিউস সানি ১৪৪৮

শিশুদের জন্য মজার ছড়া, মায়াময় গল্প আর উদ্দীপনা জাগানো গান লিখে প্রায় ছয় দশক ধরে বাংলা শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন আখতার হুসেন। সেই নিবেদিতপ্রাণ শিশুসাহিত্যিক আর নেই। বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং তাঁর দুই ছেলে পান্থ ও প্রমিত মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন আখতার হুসেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন অসুস্থতায় ভুগছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিনি ক্যানসারেও আক্রান্ত ছিলেন। সর্বশেষ তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় এবং শরীরের রক্তচাপও কমে যায়।

শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে তাঁকে রাজধানীর ফার্মগেটের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে নেওয়া হয় বারডেম হাসপাতালে। পরে গ্রিন লাইফ হাসপাতাল হয়ে আবার তাঁকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়। গত শুক্রবার থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার সেখানেই তাঁর হৃৎস্পন্দন থেমে যায়।

পরিবার জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব তেজগাঁও রেলওয়ে জামে মসজিদে আখতার হুসেনের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তাঁর মরদেহ বারডেমের হিমঘরে রাখা হবে। শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে এবং পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।

শিশুসাহিত্যের জগতে আখতার হুসেনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সহজ ও প্রাণবন্ত ভাষা। শিশুদের কঠিন শব্দের জালে আটকে না রেখে শব্দের সঙ্গে খেলতে খেলতে সামনে এগিয়ে নেওয়ার স্বাভাবিক ছন্দ ছিল তাঁর লেখায়। এ কারণেই তাঁর অনেক ছড়া বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে স্থান পেয়েছে। একাধিক প্রজন্মের শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে তাঁর লেখা।

তবে তাঁর লেখালেখি শুধু শিশুদের আনন্দ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর কলম হয়ে উঠেছিল মানুষকে অনুপ্রাণিত করার মাধ্যম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছিল তাঁর লেখা ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা’ গানটি। অজিত রায়ের সুরে গানটি গেয়েছিলেন শিল্পী তিমির নন্দী। মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরিতে তাঁর এই গান বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।

পেশাগত জীবনেও লেখালেখির সঙ্গেই ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন আখতার হুসেন। সাংবাদিকতা করেছেন দৈনিক সংবাদ, দৈনিক জনকণ্ঠ ও প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে। পরে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রথমা প্রকাশনের পাণ্ডুলিপি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখান থেকেই তিনি অবসরে যান।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও উদীচীর সঙ্গে কাজ করেছেন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও খেলাঘরের দলীয় সংগীতের রচয়িতাও তিনি। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন আখতার হুসেন।

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে শিশু-কিশোরদের জন্য তাঁর লেখা মৌলিক ছড়া ও বইয়ের পাশাপাশি জীবনী, অনুবাদ এবং সম্পাদিত গ্রন্থ মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সর্বাধিকসংখ্যক ভুক্তি লেখার কৃতিত্বও তাঁর।

তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ এবং ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’।

বাংলা সাহিত্য ও শিশুসাহিত্যে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন আখতার হুসেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। তবে তাঁর পরিচিতজনদের কাছে পুরস্কারের চেয়েও বড় ছিল তাঁর সাদাসিধে জীবনযাপন। খ্যাতি অর্জন করেও ছিলেন নির্লোভ ও বিনয়ী। শিশু, তরুণ লেখক এবং সহকর্মীদের উৎসাহ দেওয়ার জন্যও পরিচিত ছিলেন তিনি।

প্রায় ছয় দশক ধরে শিশুদের জন্য যে আনন্দের জগৎ তৈরি করেছেন আখতার হুসেন, তাঁর মৃত্যুতে সেই দীর্ঘ যাত্রার সমাপ্তি ঘটল। তিনি আর নতুন করে ছড়া কিংবা গল্প লিখবেন না। তবে পাঠ্যপুস্তকের পাতা, শতাধিক বই, মুক্তিযুদ্ধের গান এবং কয়েক প্রজন্মের পাঠকের শৈশবের স্মৃতিতে থেকে যাবে তাঁর সৃষ্টি।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version